এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : বিলুপ্ত প্রজাতির ব্যাঙের খোঁজে চলছিল সমীক্ষা। লক্ষ্য ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার ছোট নদী ও জলাশয় ঘুরে উভচর প্রাণীটির সম্ভাব্য আবাসস্থল খুঁজে দেখা। কিন্তু সেই অভিযানের মাঝেই গবেষকদের সামনে এল এমন এক আবিষ্কার, যা তাদের নজর ঘুরিয়ে দিল হাজার হাজার বছর আগের পৃথিবীর দিকে।
নদীর তলদেশে পড়ে থাকা অদ্ভুত দেখতে একটি বস্তু প্রথমে পাথর বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু সেটি উল্টে ভালো করে পরীক্ষা করতেই সন্দেহ তৈরি হয়। পরে জীবাশ্মবিদদের পরীক্ষায় জানা যায়, সেটি কোনো সাধারণ পাথর নয়। বরং প্রায় ১১ হাজার বছর আগের একটি প্যাসিফিক ম্যাসটোডনের বিশাল দাঁত।
ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান মাতেও কাউন্টিতে। গবেষকদের কাছে আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ওই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত পাওয়া ম্যাসটোডন জীবাশ্মগুলোর মধ্যে এই দাঁতটি অন্যতম সম্পূর্ণ নমুনা বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যাঙ খুঁজতে গিয়ে মিলল প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর চিহ্ন
গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল বিলুপ্তপ্রায় একটি ব্যাঙের সন্ধান করা। সেই উদ্দেশ্যে সান মাতেও কাউন্টির বিভিন্ন ছোট জলাশয় ও নদীর আশপাশে সমীক্ষা চালানো হচ্ছিল।
অভিযানের সময় এক ভূতত্ত্ববিদ নদীর তলদেশে অস্বাভাবিক আকৃতির একটি বস্তু দেখতে পান। সেটির চেহারা অনেকটা পাথরের মতো হওয়ায় প্রথম দেখায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণ ছিল না।
কিন্তু কাছে গিয়ে বস্তুটি উল্টে দেখার পর বিষয়টি বদলে যায়। এর গঠন দেখে গবেষকের মনে হয়, এটি কোনো প্রাণীর দেহাবশেষ হতে পারে। পরে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হলে তাঁরা সেটিকে ম্যাসটোডনের দাঁত হিসেবে শনাক্ত করেন।
একটি সাধারণ সমীক্ষার মধ্যে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্মের সন্ধান গবেষকদের কাছেও ছিল অপ্রত্যাশিত।
কী এই ম্যাসটোডন?
ম্যাসটোডন ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণী। দেখতে অনেকটা বর্তমান হাতির মতো হলেও হাতি ও ম্যাসটোডন একই প্রাণী নয়। তারা আলাদা বিবর্তনীয় গোষ্ঠীর সদস্য।
উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তুষার যুগে ম্যাসটোডনের বিচরণ ছিল। বিশাল দেহ, দাঁত এবং হাতির মতো আকৃতির কারণে প্রাণীটি প্রাগৈতিহাসিক উত্তর আমেরিকার অন্যতম পরিচিত বৃহৎ স্তন্যপায়ী হিসেবে বিবেচিত হয়।
ম্যাসটোডনের দাঁতের গঠনও তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। দাঁতের ক্ষয়, আকৃতি এবং মাইক্রোস্কোপিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রাণীটি কী ধরনের খাবার খেত এবং কোন পরিবেশে বাস করত, সে সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
প্রায় ১১ হাজার বছর আগের স্মৃতি
গবেষকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া দাঁতটি প্রায় ১১ হাজার বছর পুরনো। অর্থাৎ যে প্রাণীর মুখে দাঁতটি ছিল, সেটি এমন এক সময়ে বেঁচে ছিল যখন উত্তর আমেরিকার পরিবেশ আজকের তুলনায় অনেক আলাদা ছিল।
সেই সময় পৃথিবী তুষার যুগের শেষ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন, উদ্ভিদজগতের পরিবর্তন এবং মানুষের বিস্তারের মতো নানা বিষয় উত্তর আমেরিকার বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।
প্রায় ১১ হাজার বছর আগে ম্যাসটোডনসহ উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটি বৃহৎ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে তাদের হাড়, দাঁত ও অন্যান্য জীবাশ্ম আজও অতীত পৃথিবী সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে চলেছে।
দাঁতটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কোনো প্রাণীর জীবাশ্ম আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার সম্পূর্ণতা অনেক বেশি মূল্যবান। নদীর তলদেশ থেকে পাওয়া এই দাঁতটি সান মাতেও কাউন্টিতে আবিষ্কৃত ম্যাসটোডন জীবাশ্মগুলোর মধ্যে অন্যতম সম্পূর্ণ নমুনা বলে মনে করা হচ্ছে।
একটি ভালোভাবে সংরক্ষিত দাঁত থেকে শুধু প্রাণীটির অস্তিত্বের প্রমাণই পাওয়া যায় না। এর গঠন বিশ্লেষণ করে প্রাণীটির বয়স, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশ সম্পর্কে গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া দাঁতটি কোথায় পাওয়া গেছে, আশপাশের ভূতাত্ত্বিক স্তর কেমন এবং একই এলাকার অন্য জীবাশ্মের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেও অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এবার হবে বয়স নির্ধারণ ও ৩ডি প্রতিলিপি
উদ্ধার করা ম্যাসটোডনের দাঁতটি গবেষণার জন্য স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মটির বয়স আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করার কাজ করবেন।
শুধু বয়স নির্ধারণ নয়, দাঁতটির একটি বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক বা 3D প্রতিলিপি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে গবেষকেরা নমুনাটিকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
3D মডেল তৈরি হলে মূল জীবাশ্মটি বারবার সরাসরি হাতে না ধরেও তার আকৃতি ও গঠন নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে। শিক্ষামূলক কাজ ও ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রেও এমন প্রতিলিপি কার্যকর হতে পারে।
একটি দাঁত, বহু প্রশ্নের উত্তর
একটি বিশাল দাঁত দেখতে হয়তো শুধু প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দেহাবশেষ মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ জীবাশ্ম আসলে অতীতের পরিবেশের একটি প্রাকৃতিক রেকর্ড।
এই দাঁত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানতে চাইতে পারেন—ম্যাসটোডনটি কী খেত, কোন ধরনের পরিবেশে বাস করত, তার জীবনকালের কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে কী ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল এবং তার বিলুপ্তির সময়কার পরিবেশ কেমন ছিল।
একই সঙ্গে ওই এলাকার অন্যান্য জীবাশ্ম ও ভূতাত্ত্বিক তথ্যের সঙ্গে দাঁতটির তথ্য মিলিয়ে তুষার যুগের শেষ দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবেশ কেমন ছিল, তারও একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি হতে পারে।
ব্যাঙের সমীক্ষা থেকে তুষার যুগের আবিষ্কার
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, গবেষকদের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা খুঁজছিলেন ব্যাঙের সম্ভাব্য আবাসস্থল। সেই অনুসন্ধানের সময় নদীর তলায় পড়ে থাকা একটি অদ্ভুত বস্তু তাঁদের নিয়ে গেল প্রায় ১১ হাজার বছর আগের পৃথিবীতে।
প্রথম দেখায় সাধারণ পাথর মনে হওয়া বস্তুটি যে আসলে বিশাল এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দাঁত, তা শনাক্ত হওয়ার পর পুরো অভিযানের গুরুত্বই বদলে যায়।
প্রকৃতির মধ্যে এমন অনেক জীবাশ্ম এখনও মাটির নিচে, নদীর তলায় কিংবা পাথরের স্তরের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। সেগুলোর প্রতিটি নতুন আবিষ্কার অতীত পৃথিবীর পরিবেশ, প্রাণীজগৎ এবং জলবায়ু সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
একটি ছোট নদীর তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া এই ম্যাসটোডন দাঁত তাই শুধু একটি বিলুপ্ত প্রাণীর স্মৃতি নয়। এটি প্রায় ১১ হাজার বছর আগের উত্তর আমেরিকার জীবজগতের একটি জানালা—যার ভেতর দিয়ে অতীত পৃথিবীকে আরও একটু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।



