সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeসর্বশেষ সংবাদমাথার ভেতরের রহস্য ধরবে ছোট্ট যন্ত্র, বন্য প্রাণীর মস্তিষ্কে নজর বিজ্ঞানীদের

মাথার ভেতরের রহস্য ধরবে ছোট্ট যন্ত্র, বন্য প্রাণীর মস্তিষ্কে নজর বিজ্ঞানীদের

এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করার সক্ষমতা। গবেষকদের দাবি, WILD একটানা কয়েক মাস পর্যন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপের তথ্য রেকর্ড করতে পারে।

এনবি সংবাদ আইটি ডেস্ক : ল্যাবরেটরির চার দেয়ালের মধ্যে প্রাণীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করার দিন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এবার তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে ঘুরে বেড়ানোর সময় মস্তিষ্কে ঠিক কী ধরনের কার্যকলাপ চলছে, তা সরাসরি রেকর্ড করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীদের সামনে।

গবেষকেরা তৈরি করেছেন অত্যন্ত ছোট ও হালকা একটি তারবিহীন যন্ত্র। এর নাম WILD, অর্থাৎ Wireless Implantable Logging Device। আকারে এতটাই ছোট যে এর ওজন একটি ছোট কয়েনেরও কম। প্রাণীর মাথায় বসানো এই যন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যন্ত্রটি ব্যবহারের পর প্রাণীকে নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষাগারে আটকে রাখতে হয় না। নিজের পরিচিত পরিবেশে খাবার খোঁজা, চলাফেরা, অন্য প্রাণীর সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নতুন জায়গা চিনে নেওয়ার মতো স্বাভাবিক আচরণের মধ্যেই মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা সম্ভব।

প্রাণীর মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রাণীর আচরণ অনেক সময় প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণের মতো নাও হতে পারে।

একটি ইঁদুর যখন গবেষণাগারের নির্দিষ্ট জায়গায় বারবার চলাফেরা করে, তখন তার মস্তিষ্কে যে ধরনের নিউরন সক্রিয় হয়, সেটি জঙ্গলে বা খোলা জায়গায় একই প্রাণী চলাফেরা করার সময়ও একইভাবে কাজ করে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন ছিল।

WILD সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারে। প্রাণীকে স্বাভাবিক পরিবেশে চলাফেরা করতে দিয়েই তার মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যকলাপ রেকর্ড করা যায়।

ফলে বিজ্ঞানীরা শুধু প্রাণীটি কী করছে তা নয়, সেই কাজ করার সময় তার মস্তিষ্কে কী ঘটছে, সেটিও একইসঙ্গে দেখতে পারবেন।

WILD-এর বিশেষত্ব শুধু মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণার সময় প্রাণীর চলাফেরা, চোখের নড়াচড়া এবং গলার আওয়াজের মতো বিভিন্ন তথ্যও সংগ্রহ করা যায়।

এর ফলে একটি প্রাণীর আচরণ এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মধ্যে সম্পর্ক আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

ধরা যাক, একটি পাখি হঠাৎ কোনো শব্দ শুনে সতর্ক হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তার চোখ কীভাবে নড়ল, শরীর কোন দিকে ঘুরল এবং মস্তিষ্কের কোন অংশের নিউরন সক্রিয় হলো—এ ধরনের একাধিক তথ্য একই সময় বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

আবার কোনো বাদুড় পরিচিত এলাকা থেকে নতুন এলাকায় গেলে তার মস্তিষ্কের স্থান শনাক্তকরণ বা পথ খোঁজার সঙ্গে যুক্ত নিউরন কীভাবে কাজ করছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।

এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করার সক্ষমতা। গবেষকদের দাবি, WILD একটানা কয়েক মাস পর্যন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপের তথ্য রেকর্ড করতে পারে।

দীর্ঘ সময়ের এই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন ধরনের গবেষণার সুযোগ তৈরি করছে। কারণ কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষায় কোনো প্রাণীর আচরণের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত ধরা পড়তে পারে। কিন্তু মাসের পর মাস তথ্য সংগ্রহ করলে একই প্রাণীর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা তুলনা করা সম্ভব হবে।

যেমন খাবারের সন্ধান, শিকারির উপস্থিতি, সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ, বিশ্রাম কিংবা নতুন পরিবেশে প্রবেশ—প্রতিটি পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ আলাদা হতে পারে।

গবেষকেরা ইতিমধ্যে খোলা পরিবেশে ইঁদুরের ওপর এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। সেখানে মস্তিষ্কের প্লেস সেল নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের কোষের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

প্লেস সেল মস্তিষ্কের স্থান-সংক্রান্ত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত। প্রাণী কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করলে এই কোষগুলোর নির্দিষ্ট কার্যকলাপ দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে প্রাণীটি নিজের অবস্থান ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে কীভাবে ধারণা তৈরি করছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা।

খোলা পরিবেশে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে এই নিউরাল কার্যকলাপের ধরন ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দেখা কার্যকলাপের থেকে আলাদা হতে পারে।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হতে পারে, প্রাণীর মস্তিষ্ক বাস্তব পরিবেশের জটিলতা অনুযায়ী এমনভাবে কাজ করে, যা ছোট ও নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

ইঁদুরের ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা সফল হওয়ার পর প্রযুক্তিটির ব্যবহার আরও বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে। পাখি, বাদুড় এবং বাঁদরের মতো প্রাণীর ওপরও এই ধরনের মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি প্রাণীর জীবনযাপন ও চলাফেরার ধরন আলাদা। পাখি আকাশে উড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, বাদুড় অন্ধকারে শব্দের প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়, আর বাঁদর সামাজিক দলের মধ্যে থেকে জটিল যোগাযোগ করে।

তাই এই প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা গেলে নিউরোসায়েন্সের অনেক প্রশ্নের নতুন উত্তর পাওয়া যেতে পারে।

প্রাণীরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—এটি জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একটি প্রাণী কোনো পথ বেছে নেওয়ার আগে কীভাবে পরিবেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে? বিপদ বুঝতে পারলে মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন ঘটে? নিজের দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কোন ধরনের নিউরন সক্রিয় হয়?

এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে WILD-এর মতো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাণী যখন বাস্তব পরিবেশে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন তার মস্তিষ্কের কার্যকলাপ এবং একই সময়ে তার আচরণ পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে শুধু ‘কী করল’ নয়, বরং ‘কেন এবং কীভাবে করল’—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রাণীদের নিয়ে অনেক গবেষণাই বন্দি অবস্থায় পরিচালিত হয়। এর সুবিধা হলো গবেষকেরা পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট আচরণ বারবার পরীক্ষা করা যায়।

তবে প্রকৃত পরিবেশ অনেক বেশি জটিল। সেখানে খাবারের সন্ধান, শিকারির ভয়, আবহাওয়া, সামাজিক সম্পর্ক এবং চারপাশের পরিবর্তন—সবকিছু প্রাণীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

WILD-এর মতো ছোট তারবিহীন ডিভাইস এই দুই পরিবেশের পার্থক্য বোঝার সুযোগ বাড়াতে পারে। একই প্রাণী নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা তুলনা করাও সহজ হবে।

প্রাণীর মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় এতদিন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল স্বাভাবিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে নিউরনের কার্যকলাপ রেকর্ড করা। নতুন প্রজন্মের ক্ষুদ্র ও তারবিহীন প্রযুক্তি সেই বাধা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।

এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রাণীর স্মৃতি, স্থানচেতনা, যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিপদ শনাক্ত করার মতো বিষয় আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রযুক্তিটির ব্যবহারেও গবেষকদের প্রাণীর কল্যাণ, যন্ত্রের ওজন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মতো বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

সব মিলিয়ে, প্রাণীকে শুধু বাইরে থেকে দেখে তার আচরণ বোঝার বদলে এবার তার মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গেও সেই আচরণ মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রকৃতির মাঝে একটি প্রাণী যখন নিজের মতো করে ঘুরে বেড়াবে, তখন তার মাথার ভেতরে কী ঘটছে—সেই অদৃশ্য গল্পই হয়তো আগামী দিনের নিউরোসায়েন্সের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ