সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeএক্সক্লুসিভসমুদ্রের তলায় ১৬২ বছর! উদ্ধার গিনেসের পুরনো বিয়ারের বোতল, কী রয়েছে ভিতরে?

সমুদ্রের তলায় ১৬২ বছর! উদ্ধার গিনেসের পুরনো বিয়ারের বোতল, কী রয়েছে ভিতরে?

গিনেস বিশ্বের পরিচিত বিয়ার প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৭৫৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আর্থার গিনেস এই সংস্থার সূচনা করেন। সংস্থাটি বিশেষভাবে পরিচিত তার গাঢ় রঙের স্টাউট বিয়ারের জন্য।

এনবি সংবাদ, অনলাইন : সমুদ্রের গভীরে বছরের পর বছর, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাসের নানা অজানা অধ্যায়। কখনও ডুবে যাওয়া জাহাজ, কখনও প্রাচীন মুদ্রা, আবার কখনও এমন কিছু সামগ্রী উদ্ধার হয়, যা বিজ্ঞানীদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের উপকূলের কাছে সমুদ্রের তলায় ডুবে থাকা একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হওয়া বিয়ারের বোতল ঘিরে তৈরি হয়েছে তেমনই কৌতূহল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বোতলটি প্রায় ১৬২ বছর পুরনো। অথচ সেটির ভিতরে থাকা তরল এখনও অক্ষত থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বোতলের গায়ে থাকা লেখা থেকে জানা গিয়েছে, এটি বিখ্যাত আইরিশ বিয়ার প্রস্তুতকারী সংস্থা গিনেসের তৈরি। ১৮৬৪ সালের এই বোতলটি দীর্ঘ সময় সমুদ্রের তলায় পড়ে থাকলেও কীভাবে অক্ষত রয়ে গেল, তা নিয়েই এখন আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে বোতলের ভিতরের তরল সত্যিই পানযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে, বোতলের মুখে লাগানো কর্কের ভিতর দিয়ে সমুদ্রের জল ঢুকেছিল কি না, সেটিই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সমুদ্রের তলায় ছবি তুলতে গিয়ে মিলল ১৬২ বছরের পুরনো বোতল

এই আশ্চর্য আবিষ্কারের পিছনে রয়েছেন বেলজিয়ামের এক ফটোগ্রাফার। স্থলভাগের পরিবর্তে সমুদ্রের তলদেশে ছবি তোলাতেই তাঁর বিশেষ দক্ষতা। সামুদ্রিক পরিবেশ, ডুবে যাওয়া জাহাজ এবং জলের নীচে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন নিদর্শনের ছবি তুলতে তিনি মাঝেমধ্যেই গভীর সমুদ্রে ডুব দেন।

এমনই এক অভিযানে ইংল্যান্ডের উপকূলের কাছে সমুদ্রের নীচে একটি ভাঙা জাহাজের সন্ধান পান তিনি। জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের আশপাশে ঘুরে দেখার সময় তাঁর নজরে আসে একটি বোতল। সেটি সাধারণ কোনও বোতল বলে মনে হলেও, পরে দেখা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাস।

বোতলটি উদ্ধার করে জলের উপরে নিয়ে আসেন ওই ফটোগ্রাফার। এরপর সেটির গায়ে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করে পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি পুরনো বিয়ারের বোতল। আরও ভালো করে পরিষ্কার করার পর বোতলের গায়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘গিনেস’ নামটি।

এই নামই আবিষ্কারটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কারণ, বোতলটি কেবল পুরনো নয়, এটি উনিশ শতকের বিয়ার শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

১৮৬৪ সালের গিনেস বিয়ারের বোতল, কীভাবে শনাক্ত হল?

গিনেস বিশ্বের পরিচিত বিয়ার প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৭৫৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আর্থার গিনেস এই সংস্থার সূচনা করেন। সংস্থাটি বিশেষভাবে পরিচিত তার গাঢ় রঙের স্টাউট বিয়ারের জন্য।

উদ্ধার হওয়া বোতলটির গায়ে গিনেসের নাম এবং সেটির নির্মাণকাল সম্পর্কে পাওয়া তথ্য থেকে অনুমান করা হচ্ছে, এটি ১৮৬৪ সালের তৈরি। অর্থাৎ, বোতলটি তৈরি হওয়ার পর কেটে গিয়েছে প্রায় ১৬২ বছর।

উনিশ শতকে কাচের বোতল তৈরির পদ্ধতি আজকের তুলনায় অনেকটাই আলাদা ছিল। তখন মোটা কাচের বোতল ব্যবহার করা হত। এই ধরনের বোতল সহজে ভেঙে যেত না এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারত।

উদ্ধার হওয়া বোতলটিও পুরু, গাঢ় রঙের কাচ দিয়ে তৈরি। দীর্ঘ সময় সমুদ্রের তলায় থাকার পরও সেটি অক্ষত থাকায় বোতলটির নির্মাণশৈলী এবং সংরক্ষণের পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে শুধু বোতলটি অক্ষত থাকলেই যে তার ভিতরের তরলও নিরাপদ রয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বোতলের মুখের সিল কতটা ভালো ছিল এবং এত বছর ধরে তার ভিতরে কী ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটেছে, তা জানাও জরুরি।

কর্ক দিয়ে বন্ধ ছিল বোতলের মুখ, তাতেই কি রক্ষা পেয়েছে তরল?

প্রাচীন বোতলটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, সেটির মুখ কর্ক দিয়ে বন্ধ করা ছিল। বোতলটি উদ্ধার করার সময় সেটি খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়নি। ফলে ভিতরের তরল বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে কতটা এসেছে, তা বোঝার সুযোগ রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে কাচের বোতল বন্ধ করার জন্য কর্কের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কর্ক প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা বোতলের ভিতরের তরলকে বাইরের বাতাসের সংস্পর্শ থেকে অনেকটাই দূরে রাখতে পারে।

কিন্তু সমুদ্রের নীচে দীর্ঘদিন থাকার পরিস্থিতি স্থলভাগের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে জলের চাপ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, লবণাক্ততা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান বোতলটির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কর্কের সিল দুর্বল হয়ে গেলে তার ভিতর দিয়ে অল্প পরিমাণে জল প্রবেশের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার বোতলের মুখের সিল অক্ষত থাকলেও ভিতরের বিয়ারের স্বাদ, গন্ধ এবং রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এই কারণেই উদ্ধার হওয়া বোতলটির ভিতরের তরল পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে বোতলটি অক্ষত দেখালেও ভিতরের তরলের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

১৬২ বছর পরও কি বিয়ার পানযোগ্য থাকতে পারে?

এই আবিষ্কারকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—১৬২ বছর আগে বোতলে ভরা বিয়ার কি এখনও পান করা সম্ভব?

প্রাথমিকভাবে তরলটি পানযোগ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কোনও পানীয় দীর্ঘ সময় বোতলের ভিতরে অক্ষত থাকলেই সেটি খাওয়ার উপযোগী থাকবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

বিয়ারের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে একাধিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। অক্সিজেনের সংস্পর্শ, তাপমাত্রা, আলো এবং বোতলের ভিতরের রাসায়নিক পরিবেশ পানীয়টির গুণমানকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বিয়ারের স্বাদ ও গন্ধও মূল অবস্থার তুলনায় অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

এ ছাড়া সমুদ্রের তলায় বোতলটি যে পরিবেশে ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বোতলের ভিতরে সমুদ্রের জল ঢুকে থাকলে তার রাসায়নিক গঠন বদলে যেতে পারে। বাইরের কোনও দূষক ভিতরে প্রবেশ করলে নিরাপত্তার প্রশ্নও উঠতে পারে।

তাই তরলটির নমুনা পরীক্ষা করে তার রাসায়নিক উপাদান, সম্ভাব্য দূষণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে অণুজীবের উপস্থিতিও পরীক্ষা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিরাপদ বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই তরল পান করা উচিত নয়। শুধু বয়স, বোতলের অক্ষত অবস্থা কিংবা প্রাথমিক অনুমানের ভিত্তিতে কোনও পানীয়কে নিরাপদ ঘোষণা করা যায় না।

সমুদ্রের তলায় ডুবে থাকা জাহাজ কেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র?

সমুদ্রের তলায় ডুবে থাকা জাহাজগুলি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কোনও জাহাজ দুর্ঘটনায় ডুবে গেলে তার সঙ্গে তলিয়ে যেতে পারে সেই সময়ের মানুষের ব্যবহার করা নানা সামগ্রী। এসব নিদর্শন উদ্ধার করে গবেষকেরা অতীতের বাণিজ্য, যাতায়াত, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানতে পারেন।

প্রাচীন বোতল, মুদ্রা, বাসনপত্র এবং জাহাজের কাঠামো থেকে জানা যেতে পারে, কোন সময়ে কোন পণ্য পরিবহণ করা হত। বোতলের গায়ে থাকা নাম, নকশা কিংবা উৎপাদনের চিহ্ন থেকেও প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং সম্ভাব্য সময়কাল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব।

ইংল্যান্ডের উপকূলের কাছে উদ্ধার হওয়া গিনেসের এই বোতলটিও সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি উনিশ শতকের বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন এবং বোতল ব্যবহারের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ ধরনের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি। বোতলটি ঠিক কোথায় পাওয়া গিয়েছে, জাহাজটির সম্ভাব্য পরিচয় কী এবং আশপাশে আর কী কী সামগ্রী রয়েছে, সেসব তথ্য নথিবদ্ধ করলে ভবিষ্যতের গবেষণায় সুবিধা হবে।

পুরনো বোতল থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের কী শেখার আছে?

এই ঘটনা শুধু একটি পুরনো বিয়ারের বোতল উদ্ধারের গল্প নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ, কাচের স্থায়িত্ব এবং প্রাচীন খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণারও একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র।

কাচ সাধারণত অনেক ধরনের পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। তবে কাচের গঠন, পুরুত্ব এবং আশপাশের জলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে তার পৃষ্ঠে পরিবর্তন ঘটতে পারে। একইভাবে, বোতলের ভিতরের তরল কতটা ভালো থাকবে, তা নির্ভর করে বোতলের সিল, সংরক্ষণের পরিবেশ এবং তরলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের উপর।

বিজ্ঞানীরা যদি বোতলটির ভিতরের তরল পরীক্ষা করেন, তাহলে এত দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ পাত্রে থাকা একটি পানীয়ের পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, উনিশ শতকের বিয়ার উৎপাদন এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কেও নতুন সূত্র মিলতে পারে।

তবে কোনও নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তরলটির নিরাপত্তা বা পানযোগ্যতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

১৬২ বছরের পুরনো গিনেস বোতল ঘিরে রহস্য এখনও কাটেনি

সমুদ্রের তলায় ১৬২ বছর ধরে পড়ে থাকা গিনেসের বোতলটি ইতিমধ্যেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। বেলজিয়ামের এক ফটোগ্রাফারের সমুদ্রের নীচে ছবি তোলার অভিযান থেকে উঠে এসেছে উনিশ শতকের একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক নিদর্শন।

বোতলটির অক্ষত অবস্থা এবং ভিতরে তরল থাকার বিষয়টি আবিষ্কারটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে আসল রহস্য এখনও বোতলের ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময় পরও তরলটি কতটা অপরিবর্তিত রয়েছে, কর্কের সিল দিয়ে সমুদ্রের জল প্রবেশ করেছিল কি না এবং সেটি আদৌ পানযোগ্য কি না, তার উত্তর মিলবে পরীক্ষার পরেই।

ইতিহাসের এমন ছোট ছোট নিদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্রের গভীরে এখনও কত অজানা গল্প লুকিয়ে রয়েছে। আর কখনও কখনও সেই গল্পের সূত্র হতে পারে একটি সাধারণ কাচের বোতল, যা সময়ের স্রোত পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের হাতে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ