এনবি সংবাদ ডেস্ক : লাল গ্রহ মঙ্গলকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। পৃথিবীর প্রতিবেশী এই গ্রহে একসময় কী ধরনের পরিবেশ ছিল, কীভাবে তার ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং সেখানে কী কী খনিজ পদার্থ রয়েছে, তা জানতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এবার মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা একটি উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এমন এক ধরনের গাঢ় লাল পাথরের সন্ধান মিলেছে, যা নতুন করে আলোচনায় এনেছে গ্রহটির প্রাচীন ইতিহাস।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, এই পাথর শুধু দেখতে সুন্দর নয়, প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসেও এর মতো রত্নের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। প্রাচীন মিশরীয় ও রোমান অভিজাতদের মধ্যে লাল রঙের মূল্যবান পাথরের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। নতুন আবিষ্কারে পাওয়া খনিজটির গঠন ও উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা মঙ্গলগ্রহের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
তবে এই পাথর ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেটাই এখন বিজ্ঞানীদের কাছে বড় প্রশ্ন। এটি কি মঙ্গলের অভ্যন্তরে তীব্র তাপ ও চাপের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি অন্য কোনও মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে এর উৎপত্তি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই চলছে গবেষণা।
মঙ্গলগ্রহের প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। মহাকাশযান ও রোভার পাঠিয়ে সরাসরি গ্রহটির পৃষ্ঠ পরীক্ষা করার পাশাপাশি পৃথিবীতে পাওয়া মঙ্গলগ্রহের উল্কাপিণ্ডও তাঁদের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে কোনও গ্রহাণু বা অন্য মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে পাথরের টুকরো মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে। দীর্ঘ যাত্রার পর সেই টুকরোর কোনও অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে উল্কাপিণ্ড হিসেবে মাটিতে পড়ে। এই ধরনের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের খনিজ, রাসায়নিক গঠন এবং ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।
সম্প্রতি এমনই একটি মঙ্গলজাত উল্কাপিণ্ড পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের নজরে আসে গাঢ় লাল রঙের একটি পাথুরে উপাদান। এর বৈশিষ্ট্য সাধারণ পাথরের তুলনায় আলাদা হওয়ায় গবেষকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পাথরটির গঠন বিশ্লেষণ করে এর উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা চলছে। কারণ, কোনও গ্রহের শিলার মধ্যে কী ধরনের খনিজ রয়েছে, তা থেকে সেই গ্রহের অতীতে কতটা তাপ ছিল, সেখানে কী ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটেছে এবং কীভাবে শিলার পরিবর্তন হয়েছে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়।
তবে এই আবিষ্কার মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে এতদিনের সব ধারণা বদলে দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো ঠিক হবে না। বরং এটি গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গাঢ় লাল রঙের মূল্যবান পাথরের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার সম্পর্ক বহু পুরনো। প্রাচীন মিশরে গয়না, অলংকার এবং বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরিতে নানা ধরনের রঙিন পাথর ব্যবহার করা হত। রোমান সমাজের অভিজাতদের মধ্যেও মূল্যবান রত্নের কদর ছিল।
লাল রঙের পাথর মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ তার উজ্জ্বল রং এবং বিরলতা। পাথরের গঠন ও রং অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের রত্নের মূল্য নির্ধারিত হত। কিছু পাথর গয়না তৈরিতে ব্যবহৃত হত, আবার কিছু পাথরের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা কিংবা বিশেষ প্রতীকী অর্থও জড়িয়ে ছিল।
তবে প্রাচীন মিশরীয় ও রোমানরা ঠিক কোন ধরনের লাল রত্ন ব্যবহার করতেন, তা নির্দিষ্ট খনিজ শনাক্ত না করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গারনেট, কার্নেলিয়ান এবং অন্যান্য লালচে খনিজের ব্যবহার প্রাচীন অলংকারে দেখা যায়। কিন্তু মঙ্গলজাত উল্কাপিণ্ডে পাওয়া পাথরটি এর মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট খনিজের সঙ্গে মেলে কি না, তা জানতে বিস্তারিত পরীক্ষার প্রয়োজন।
এই জায়গাতেই আবিষ্কারটির গুরুত্ব। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতায় পরিচিত কোনও খনিজের সঙ্গে মঙ্গলগ্রহের শিলার মিল পাওয়া গেলে, তা দুই গ্রহের উপাদান সম্পর্কে তুলনামূলক গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু রং মিললেই দুটি পাথর একই খনিজের বলে ধরে নেওয়া যায় না।
পাথরের রং এবং গঠন নির্ভর করে তার মধ্যে থাকা খনিজ উপাদান, রাসায়নিক বিক্রিয়া ও গঠনের সময়কার পরিবেশের উপর। কিছু পাথর পৃথিবীর গভীরে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় রূপান্তরিত শিলা গঠন।
আবার আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা গলিত শিলা ঠান্ডা হয়ে তৈরি করতে পারে আগ্নেয় শিলা। গ্রহের অভ্যন্তরের তাপ, শিলার রাসায়নিক গঠন এবং শীতল হওয়ার গতি অনুযায়ী এই শিলার মধ্যে বিভিন্ন খনিজ স্ফটিক তৈরি হতে পারে।
মঙ্গলগ্রহেও একসময় ব্যাপক আগ্নেয় কার্যকলাপ ঘটেছে বলে বিজ্ঞানীরা জানেন। গ্রহটির বিশাল আগ্নেয়গিরি এবং বিস্তৃত লাভার সমভূমি তারই প্রমাণ। ফলে মঙ্গলের শিলার মধ্যে আগ্নেয় প্রক্রিয়ায় তৈরি বিভিন্ন খনিজ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে, গ্রহাণু বা উল্কাপিণ্ডের সংঘর্ষের ফলে শিলার উপর অত্যন্ত বেশি চাপ ও তাপ সৃষ্টি হতে পারে। এমন সংঘর্ষে শিলার গঠন বদলে যেতে পারে এবং নতুন খনিজ বা খনিজের নতুন রূপ তৈরি হতে পারে।
উদ্ধার হওয়া পাথরটির ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া কাজ করেছে, তা নির্ধারণ করতে হলে তার স্ফটিকের গঠন, রাসায়নিক উপাদান এবং আশপাশের শিলার বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হবে। এসব তথ্য থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন, পাথরটি মঙ্গলের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছিল, নাকি সংঘর্ষের মতো কোনও ঘটনার সঙ্গে এর উৎপত্তি জড়িত।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল পাথরটির উৎপত্তিস্থল। মঙ্গলগ্রহ থেকে আসা কোনও উল্কাপিণ্ডে একটি খনিজ পাওয়া গেলেই যে সেটি নিশ্চিতভাবে মঙ্গলের মাটিতেই তৈরি হয়েছিল, তা বলা যায় না। খনিজটির উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে একাধিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজন।
প্রথম সম্ভাবনা হল, পাথরটি মঙ্গলগ্রহের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছিল। গ্রহটির তাপমাত্রা, চাপ এবং রাসায়নিক পরিবেশের প্রভাবে সেখানে এমন খনিজের জন্ম হয়ে থাকতে পারে, যা আগে শনাক্ত করা যায়নি বা খুব কম পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল, কোনও বড় সংঘর্ষের কারণে পাথরটির গঠন বদলে গিয়েছে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের ফলে প্রচণ্ড চাপ ও তাপ সৃষ্টি হতে পারে। তার ফলে শিলার মধ্যে থাকা খনিজের গঠন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃতীয় সম্ভাবনাটি আরও জটিল। পাথরটির উৎপত্তি, উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং মহাকাশে যাত্রার সময়কার ঘটনাগুলি বুঝতে হলে নমুনাটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে পাথরটি অন্য কোথাও তৈরি হয়ে পরে মঙ্গলে এসে পড়েছিল, এমন দাবি করার জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত খনিজের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, আইসোটোপের অনুপাত এবং আশপাশের শিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। তাই পাথরটির প্রকৃত উৎস জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠ আজ শুষ্ক ও ধুলোময় হলেও অতীতে সেখানে জলপ্রবাহের অস্তিত্ব ছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। গ্রহটির পৃষ্ঠে প্রাচীন নদীখাত, হ্রদের সম্ভাব্য চিহ্ন এবং জলের সঙ্গে সম্পর্কিত খনিজের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
এই ধরনের প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, মঙ্গলের পরিবেশ একসময় বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই আলাদা ছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তন ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তা এখনও গবেষণার বিষয়।
নতুন খনিজের সন্ধান মিললে সেই ইতিহাসের কোনও অজানা অংশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে, খনিজটি যদি উচ্চ তাপ ও চাপের প্রভাবে তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা মঙ্গলের অতীতের সংঘর্ষ, আগ্নেয় কার্যকলাপ কিংবা ভূত্বকের পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।
একটি পাথর থেকেই অবশ্য গোটা গ্রহের ইতিহাস নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন নমুনার তথ্যের সঙ্গে নতুন আবিষ্কারের তুলনা করতে হয়। একই ধরনের খনিজ অন্য নমুনায় পাওয়া যায় কি না, তার গঠন কতটা আলাদা এবং কোন পরিস্থিতিতে সেটি তৈরি হয়েছে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই মঙ্গলজাত উল্কাপিণ্ড নিয়ে গবেষণা মহাকাশবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। পৃথিবীতে পাওয়া এই পাথরগুলি মঙ্গলগ্রহের এমন কিছু অংশের খবর দিতে পারে, যেখানে এখনও কোনও মহাকাশযান পৌঁছতে পারেনি।
মঙ্গলগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেখানে একসময় অণুজীবের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল কি না এবং গ্রহটির জলবায়ু কীভাবে বদলে গিয়েছে, এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে।
রোভার ও অরবিটারের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের পাশাপাশি মঙ্গলজাত উল্কাপিণ্ড এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, পরীক্ষাগারে উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নমুনার এমন সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যও পরীক্ষা করা সম্ভব, যা দূর থেকে মহাকাশযানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা কঠিন।
গাঢ় লাল পাথরের এই আবিষ্কারও সেই গবেষণার অংশ। এটি যদি মঙ্গলগ্রহের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য দেয়, তবে ভবিষ্যতে লাল গ্রহে আরও কোন ধরনের খনিজের সন্ধান মিলতে পারে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে।
তবে এই আবিষ্কারের সঙ্গে প্রাণের অস্তিত্বের সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। খনিজের সন্ধান এবং প্রাণের সম্ভাবনা দুটি আলাদা গবেষণার বিষয়। একটি নতুন খনিজ শনাক্ত হওয়া মানেই সেখানে প্রাণ ছিল, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
মঙ্গলগ্রহের উল্কাপিণ্ডে পাওয়া গাঢ় লাল পাথরটি বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে। এর সঙ্গে প্রাচীন মিশর ও রোমে ব্যবহৃত লাল রঙের রত্নের তুলনা করার আগ্রহ তৈরি হলেও, দুটি পাথরের মধ্যে প্রকৃত মিল রয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে খনিজের বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণের উপর।
পাথরটি মঙ্গলের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছিল, নাকি তীব্র সংঘর্ষের ফলে তার গঠন বদলে গিয়েছে, সেটিও এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে এর রাসায়নিক গঠন ও স্ফটিকের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে গ্রহটির অতীত সম্পর্কে নতুন সূত্র পাওয়া সম্ভব।
লাল গ্রহকে ঘিরে প্রতিটি নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের মনে করিয়ে দেয়, মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। একটি ছোট পাথরও কখনও কখনও কোটি কোটি বছরের ইতিহাসের দরজা খুলে দিতে পারে। এই রহস্যময় লাল পাথরের ক্ষেত্রেও শেষ কথা বলবে বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও পরীক্ষার ফল।



