এনবি সংবাদ, লাইফস্টাইল ডেস্ক : নতুন বছর মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন আর আগামী দিনগুলো ভালো কাটার প্রত্যাশা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষকে ঘিরে নানা ধরনের প্রথা ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কোথাও আতশবাজি, কোথাও বিশেষ খাবার, আবার কোথাও রয়েছে একেবারেই ব্যতিক্রমী কিছু রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এমনই এক অদ্ভুত নববর্ষের প্রথা রয়েছে গ্রিসে।
গ্রিসের বহু পরিবারে বছরের শেষ দিনে বাড়ির দরজায় গোছা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় পেঁয়াজ। সাধারণ সময়ে যে পেঁয়াজের কল বেরিয়ে গেলে মানুষ সেটিকে খুব একটা পছন্দ করেন না, নববর্ষের সময় সেই পেঁয়াজই হয়ে ওঠে সৌভাগ্যের প্রতীক। দরজার সামনে ঝোলানো পেঁয়াজকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্য।
নববর্ষের আগের দিন অর্থাৎ বছরের শেষ দিনে গ্রিসের কিছু পরিবার বাড়ির প্রধান দরজায় এক গোছা পেঁয়াজ ঝুলিয়ে রাখে। একটি-দুটি নয়, বেশ কয়েকটি পেঁয়াজ একসঙ্গে বেঁধে দরজার সামনে ঝোলানো হয়।
এই পেঁয়াজের বিশেষত্ব হল, সেগুলিতে কল বা অঙ্কুর বেরিয়ে থাকে। সাধারণভাবে রান্নার জন্য রাখা পেঁয়াজে অঙ্কুর গজালে অনেকেই সেটিকে ব্যবহার করতে চান না। কিন্তু গ্রিসের এই প্রথায় সেই অঙ্কুরিত পেঁয়াজেরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিনে বাড়ির দরজায় এমন পেঁয়াজ ঝুলিয়ে রাখা নতুন বছরে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি ডেকে আনে। তাই বছরের অন্যান্য সময়ে পেঁয়াজের যে চেহারা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে, নববর্ষের সময় সেটিই হয়ে ওঠে শুভ প্রতীকের অংশ।
শুধু বছরের শেষ দিনেই নয়, নতুন বছরের প্রথম দিনেও দরজায় ঝুলতে থাকে পেঁয়াজের গোছা। অর্থাৎ পুরনো বছর থেকে নতুন বছরে প্রবেশের সময় পেঁয়াজটিকে বাড়ির দরজায় রাখার মধ্যেই রয়েছে এই প্রথার মূল তাৎপর্য।
গ্রিসের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, অঙ্কুরিত পেঁয়াজ নতুন জীবনের প্রতীক। মাটির নিচে থাকা একটি পেঁয়াজ থেকে নতুন করে অঙ্কুর বেরিয়ে আসার বিষয়টিকে নতুন বছরের বৃদ্ধি, পুনর্জন্ম ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই প্রথার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি সম্ভবত নতুন বছরের সকালে দেখা যায়। দরজায় ঝোলানো সেই পেঁয়াজ দিয়েই পরিবারের ছোটদের ঘুম ভাঙানোর রীতি রয়েছে কিছু গ্রিক পরিবারে।
নতুন বছরের সকালে পরিবারের বড়রা দরজা থেকে পেঁয়াজের গোছা নামিয়ে আনেন। এরপর সেই পেঁয়াজ দিয়ে শিশুদের মাথায় হালকা টোকা দেওয়া হয়। সেই টোকাতেই তাদের ঘুম থেকে জাগানো হয়।
শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও এটি গ্রিসের একটি পুরনো লোকাচার হিসেবে পরিচিত। নতুন বছরের প্রথম সকালকে এই রীতির মাধ্যমে বিশেষভাবে শুরু করার মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী অর্থ।
এই প্রথার সঙ্গে পেঁয়াজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। পেঁয়াজ মাটির নিচে থাকার পরেও অনুকূল পরিবেশ পেলে আবার অঙ্কুরিত হতে পারে। অর্থাৎ তার মধ্যে নতুন করে বেড়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে।
সেই কারণেই অঙ্কুরিত পেঁয়াজকে নতুন জীবন, বৃদ্ধি ও পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বছরের শেষ দিনে দরজায় পেঁয়াজ ঝোলানোর মাধ্যমে নতুন বছরেও যেন জীবনে বৃদ্ধি ও সৌভাগ্য আসে—এমন বিশ্বাসই এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রিসের লোকবিশ্বাসে এই রীতির সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত সৌভাগ্য নয়, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্ত। পেঁয়াজের অঙ্কুরোদ্গমকে প্রকৃতির বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন বছরের শুরুতে এই ধরনের রীতি পালন করলে পরিবারের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজ ও দেশের জন্যও শুভ ফল আসে। বিশেষ করে উর্বরতা ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধির সঙ্গে এই প্রথাকে যুক্ত করা হয়।
অবশ্য এসব বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এগুলি মূলত ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাসের অংশ।
নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর রীতি দেশভেদে সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে, কোথাও বিশেষ পোশাক পরা হয়, আবার কোথাও বাড়ির দরজা বা জানালাকে বিশেষভাবে সাজানো হয়।
গ্রিসের অঙ্কুরিত পেঁয়াজের প্রথাও সেই বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে বহু পুরনো রীতির পরিবর্তন হলেও এমন কিছু লোকাচার এখনও মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে।
তাই বছরের শেষ দিনে গ্রিসের কোনও বাড়ির দরজায় যদি গোছা গোছা অঙ্কুরিত পেঁয়াজ ঝুলতে দেখা যায়, সেটিকে নিছক রান্নাঘরের উপকরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে নতুন বছরকে ঘিরে সৌভাগ্য, বৃদ্ধি, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস। আর নতুন বছরের সকালে সেই পেঁয়াজ দিয়ে শিশুদের ঘুম ভাঙানোর রীতিটি এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।



