এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : সরকারি কর্মীদের জন্য সাধারণত বেতন, ভাতা, চিকিৎসা বা অবসরকালীন সুবিধার কথা শোনা যায়। কিন্তু প্রেম করার জন্য সরকারি উদ্যোগ, তার সঙ্গে ডেটিং অ্যাপ এবং প্রথম সাক্ষাতের খরচ—শুনতে অবাক লাগলেও এমনই এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর।
দেশটির সরকার তরুণ সরকারি কর্মীদের জন্য তৈরি করেছে বিশেষ ডেটিং প্ল্যাটফর্ম। সেখানে নির্দিষ্ট বয়সসীমার সরকারি কর্মীরা নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন। উদ্দেশ্য একটাই—উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ানো।
শুনতে অনেকটা সরকারি ‘ঘটকালি’র মতো লাগলেও এর পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুরের একটি বড় সামাজিক ও জনসংখ্যাগত সমস্যা। দেশটিতে জন্মহার দীর্ঘদিন ধরেই কমছে। ফলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক জনসংখ্যার চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সরকারের মধ্যে।
সিঙ্গাপুরের তরুণ সরকারি কর্মীদের লক্ষ্য করে চালু করা হয়েছে ‘ফার্স্ট ডেট’ নামে একটি ডেটিং অ্যাপ। বিভিন্ন সরকারি দফতরে কর্মরত ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সি কর্মীদের এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অ্যাপটি সাধারণ ডেটিং প্ল্যাটফর্মের মতো হলেও এর বিশেষত্ব হলো, এখানে ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট একটি সরকারি কর্মী গোষ্ঠীর মধ্যেই সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজবেন। ব্যবহারকারীর পছন্দ, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, আগ্রহ, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ‘ম্যাচ’ খোঁজার চেষ্টা করবে অ্যাপটি।
অর্থাৎ, দু’জন মানুষ একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে যেতে পারেন কি না, সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
প্রথমে আগ্রহী সরকারি কর্মীকে অ্যাপে নিজের প্রোফাইল তৈরি করতে হবে। সেখানে শুধু নাম বা ছবি দিলেই হবে না। জীবনযাত্রা, ব্যক্তিগত পছন্দ, আগ্রহ, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা করবে অ্যাপের ব্যবস্থা।
দু’জনের প্রোফাইলকে উপযুক্ত বলে মনে হলে দু’জনের কাছেই বার্তা পাঠানো হবে। এরপর তাঁদের হাতে থাকবে নির্দিষ্ট সময়। তাঁরা চাইলে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন এবং দেখা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্রথমেই কেউ আগ্রহী না হলে জোর করে সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ নেই। বরং পরিচয়ের প্রাথমিক অস্বস্তি কাটিয়ে দু’জনকে স্বাভাবিকভাবে একে অপরকে জানার সুযোগ দেওয়াই ব্যবস্থাটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো প্রথম সাক্ষাৎকে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা।
অর্থাৎ, অ্যাপের মাধ্যমে কোনো সরকারি কর্মী সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার পর দু’জন যদি দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে প্রথম সাক্ষাতের খরচের একটি অংশ সরকারি উদ্যোগে বহন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এখানেই বিষয়টি সাধারণ ডেটিং অ্যাপ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়।
সাধারণত ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রেমের বিষয়কে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন বৃহত্তর জনসংখ্যা নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সরকার মনে করছে, তরুণদের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক ও বিয়ের প্রবণতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে জন্মহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
এর পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুরের দ্রুত কমতে থাকা জন্মহার।
দেশটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত উন্নত রাষ্ট্র। কিন্তু উন্নত অর্থনীতির অনেক দেশের মতো সিঙ্গাপুরও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সমস্যায় পড়েছে।
কম সন্তান নেওয়া, দেরিতে বিয়ে, বিয়ের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি একক জীবন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো নানা সামাজিক কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবার গঠনের প্রবণতা কমেছে।
ফলে জন্মের সংখ্যা কমছে এবং একই সঙ্গে বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা কঠিন। তাই তরুণদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি, বিয়ে এবং পরিবার গঠনের পরিবেশ তৈরি করতেও সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের সাম্প্রতিক জনসংখ্যার তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে জন্মের সংখ্যা ৩০ হাজারের নিচে নেমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত কয়েক দশকের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, কীভাবে তরুণ প্রজন্মকে পরিবার ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা যায়।
কারণ একটি দেশের অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক, দীর্ঘমেয়াদে যদি তরুণ ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ওপর।
এই কারণেই সিঙ্গাপুরের সরকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নীতিগতভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
সরকারি কর্মীদের দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলেও এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে সাধারণ নাগরিকদের জন্যও একই ধরনের সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত ডেটিং বা ম্যাচমেকিং পরিষেবা দেখা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং সম্পর্ককে বিয়ে ও পরিবার গঠনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার কাউকে প্রেম বা বিয়েতে বাধ্য করছে না। বরং মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার মতো একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।
সিঙ্গাপুরের সমস্যা শুধু জন্মহার কমে যাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। অনেক তরুণ-তরুণী বিয়েও তুলনামূলক দেরিতে করছেন। কেউ কেউ আবার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
আবার যারা বিয়ে করছেন, তাদের একটি অংশ সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে এক বা দুই সন্তানের বেশি যেতে চাইছেন না। এর পেছনে বাড়ির দাম, শিশুর দেখাশোনার ব্যয়, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং জীবনযাত্রার উচ্চ খরচের মতো বিষয় কাজ করতে পারে।
ফলে সরকারকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক—দুই ধরনের নীতির ওপর জোর দিতে হচ্ছে।
শুধু সন্তান নেওয়ার জন্য টাকা দিলেই মানুষ সন্তান নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই তরুণদের সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বাড়ানো থেকে শুরু করে পরিবারবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি—সবকিছুকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরই প্রথম দেশ নয়, যেখানে জন্মহার বাড়ানোর জন্য সরকার সরাসরি মানুষের সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
জাপানের রাজধানী টোকিওর প্রশাসনও তরুণদের মধ্যে পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরিতে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কম জন্মহারের কারণে জাপান বহু বছর ধরেই জনসংখ্যাগত সংকট মোকাবিলা করছে।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ম্যাচমেকিং এবং গণবিবাহের মতো আয়োজন হয়েছে।
পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর মধ্যে কম জন্মহার এখন বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু। ফলে সরকারগুলো শুধু মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা শিশুভাতা দেওয়ার বাইরে গিয়ে তরুণদের পরিবার গঠনে উৎসাহিত করার নানা পদ্ধতি পরীক্ষা করছে।
সিঙ্গাপুরের আয়তন ছোট এবং প্রাকৃতিক সম্পদও সীমিত। দেশটির অর্থনীতি মূলত দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম নাগরিকের সংখ্যা কমে গেলে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়লে পেনশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয়ও বাড়বে।
তাই তরুণ প্রজন্মকে পরিবার গঠনে উৎসাহিত করা সরকারের কাছে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে এই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন উঠছে।
মানুষের প্রেম, সম্পর্ক এবং বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে সরকারের এতটা সক্রিয় হওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে সরকার যদি শুধু এমন মানুষদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে, যারা নিজেরাই এতে অংশ নিতে আগ্রহী, তাহলে বিষয়টি কতটা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও আলোচনার বিষয়।
আরও একটি প্রশ্ন হলো, ডেটিং অ্যাপে দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং কে সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। কারণ সম্পর্ক, পছন্দ, জীবনযাপন বা ব্যক্তিগত মূল্যবোধের মতো তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে পারে।
সুতরাং এমন উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু ম্যাচ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ও তথ্য নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারের আসল লক্ষ্য শুধু তরুণ সরকারি কর্মীদের প্রেমে পড়ানো নয়।
এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা পরিকল্পনা।
সরকারের আশা, তরুণরা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবেন, সম্পর্ক তৈরি করবেন, বিয়ে করবেন এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। ফলে ধীরে ধীরে জন্মহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থাৎ একটি ডেটিং অ্যাপের আড়ালে আসলে কাজ করছে বড় একটি জনসংখ্যাগত লক্ষ্য।
সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগ তাই শুধু ‘সরকারি খরচে প্রেম’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি, বয়স্ক জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর প্রশ্ন।
সরকারি অর্থে ডেটিং অ্যাপ তৈরি করে তরুণ কর্মীদের সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজে দেওয়া এবং প্রথম সাক্ষাতে আর্থিক সহায়তা—ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশের কাছে বিষয়টি নিঃসন্দেহে অদ্ভুত মনে হতে পারে।
কিন্তু সিঙ্গাপুরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে জনসংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে না; বরং কম জন্মহার ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তাই সরকারও সমস্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন সমাধান খুঁজছে।
আজ যে ‘সরকারি ঘটকালি’ দেখে অবাক লাগছে, তার পেছনে আসলে রয়েছে একটি উন্নত দেশের জনসংখ্যাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। প্রেম এখানে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, নীতিনির্ধারকদের কাছেও হয়ে উঠেছে জনসংখ্যা ধরে রাখার একটি সম্ভাব্য পথ।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সিঙ্গাপুরে কম জন্মহার এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু যে তরুণদের মনের মানুষ খুঁজে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকার নিজেই ‘ঘটক’-এর ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।



