সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিশ্ব সংবাদফ্রান্সে ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল দেশ, হাজার হাজার গ্রেফতার; ট্রাম্পের মন্তব্যে বিতর্ক

ফ্রান্সে ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল দেশ, হাজার হাজার গ্রেফতার; ট্রাম্পের মন্তব্যে বিতর্ক

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খারাপ, শিক্ষকসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং অনেক সময় নির্ধারিত ক্লাসও নেওয়া সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ফ্রান্সজুড়ে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্রবিক্ষোভ এখন বড় আকারের জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অপর্যাপ্ত সরকারি অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত ভিড়, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং দীর্ঘ ও চাপযুক্ত পাঠ্যসূচির বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। ৬ অক্টোবরের দেশব্যাপী বিক্ষোভে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য ‘গণ-অভিবাসন’ এবং ইসলামকে দায়ী করে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনটি শুধু স্কুলের সমস্যা নিয়ে নয়। তবে ফরাসি ছাত্র সংগঠন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আন্দোলনের প্রধান কারণ হিসেবে শিক্ষা খাতে অর্থাভাব, শিক্ষকসংকট ও স্কুলের পরিকাঠামোগত সমস্যার কথাই উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে এই ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। প্রথম দিকে প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি স্কুলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং উন্নত পরিকাঠামোর দাবিতে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে সেই আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খারাপ, শিক্ষকসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং অনেক সময় নির্ধারিত ক্লাসও নেওয়া সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ স্কুলের সময়সূচি এবং পড়াশোনার চাপ। শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থার এই সমস্যাগুলো শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নয়, তাঁদের মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রভাব ফেলছে।

৬ অক্টোবরের বিক্ষোভ ছিল আন্দোলনের অন্যতম বড় কর্মসূচি। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিল, স্ত্রাসবুরসহ একাধিক শহরে বড় জমায়েত হয়।

অনেক জায়গায় আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চললেও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের জনতা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করে। মঙ্গলবার প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্দোলন যত ছড়িয়েছে, গ্রেফতারের সংখ্যাও বেড়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্রে ৬ হাজারের বেশি আটকের কথা জানা যায়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

তবে গ্রেফতারের হিসাব বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আন্দোলনের শুরু থেকে মোট কতজনকে আটক করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

অন্যদিকে, বিক্ষোভে পুলিশ ও আন্দোলনকারী—উভয় পক্ষেই আহত হওয়ার খবর রয়েছে। ফরাসি সরকারের হিসাবে শত শত পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও স্কুলকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে উত্তর ফ্রান্সের লাঁস শহরে। ৫ অক্টোবর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছরের এক কিশোরের হাতে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয় এবং সে তার হাত হারায়। ঘটনার সঠিক পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে।

প্রাথমিকভাবে পুলিশের একটি সূত্র দাবি করেছিল, কিশোরটি বিস্ফোরকটি তুলে নিয়েছিল। তবে ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ফরাসি পুলিশ পরবর্তীতে ওই ধরনের স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশও ঘোষণা করেছে।

এই ঘটনা পুলিশের জনতা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ পুলিশি পদক্ষেপের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সরকার অবশ্য পুলিশের অবস্থান সমর্থন করে জানিয়েছে, সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন।

ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে, তখন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ অ্যাকাউন্টে দাবি করেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতির পেছনে ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’ রয়েছে এবং তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু স্কুলের সমস্যা নয়, বরং ইসলাম ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে।

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ফরাসি ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দাবির সঙ্গে ধর্মীয় আধিপত্যের কোনও সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আন্দোলনকারীদের প্রকাশ্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ, স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার পরিবেশের সংস্কার।

ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাতেও। বিভিন্ন সময়ে শত শত স্কুলে ক্লাস আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগে শত শত উচ্চবিদ্যালয়ে পঠনপাঠন ব্যাহত হয়েছিল।

স্কুলের গেটে ব্যারিকেড তৈরি করে শিক্ষার্থীদের অবস্থান, ক্লাস বয়কট এবং মিছিলের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসা শিক্ষকসংকট এবং স্কুলের অবকাঠামোর সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও রাস্তা অবরোধ, কোথাও স্কুলের সামনে ব্যারিকেড এবং কোথাও সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সরকারের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের শক্তি প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে।

লাঁসের ১৫ বছরের কিশোরের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ওই ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং পুলিশি ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও ধীরে ধীরে এর সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষও যুক্ত হচ্ছে। ফ্রান্স বর্তমানে সরকারি অর্থনীতি, সামাজিক ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অভিযোগও সেই বৃহত্তর অসন্তোষের অংশ হয়ে উঠেছে।

এই কারণে আন্দোলন শুধু স্কুলের শ্রেণিকক্ষের সমস্যা নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এর পরিধি বাড়ছে।

ফ্রান্সের এই ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলিতেও আলোচনায় এসেছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরেও ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং আটকের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ফ্রান্সের আন্দোলনের মূল দাবিগুলো এখনও দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরেই। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, দাবি পূরণের বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে তারা নতুন কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

ফরাসি সরকারের সামনে এখন একদিকে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমাধানের চাপ, অন্যদিকে বিক্ষোভের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়া ল্যকর্নু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার স্কুলে হিংসা ও ভাঙচুরের বিরোধিতাও করছে।

অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনগুলোও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ফ্রান্সের রাজপথে বিক্ষোভ আরও বাড়ে কি না, নাকি সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, সেটিই এখন নজরে।

ফ্রান্সের এই আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে, স্কুলের জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষকসংকট বা শ্রেণিকক্ষের অতিরিক্ত চাপের মতো বিষয় কখনও কখনও বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আর সেই আন্দোলনে যখন পুলিশি সংঘর্ষ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মন্তব্য যুক্ত হয়, তখন একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবি দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ