এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : নেপালে ফের বড়সড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া মানাং জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আচমকা তুষারধসের জেরে নিখোঁজ অন্তত ১০ জন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ট্রেকিং বা পর্বতারোহণের জন্য ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। রবিবার সকালে হিমলাং হিমল পর্বতের বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি এই তুষারধস নামে। এরপর থেকেই ওই ব্যক্তিদের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপালের প্রশাসন ইতিমধ্যেই উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উদ্ধারকাজে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নিখোঁজদের সঠিক অবস্থান এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
নেপালের মানাং জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্বতশৃঙ্গ হিমলাং হিমল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭ হাজার ১২৬ মিটার। পর্বতারোহী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এই অঞ্চল অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলাকাটি একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও।
রবিবার সকালে আচমকা বেস ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় তুষারধস নামে। তুষারের বিশাল স্তর নেমে আসার পর থেকেই অন্তত ১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে পর্বতারোহী এবং ট্রেকিং দলের সদস্যরা রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
নেপালের পর্যটন বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল জানিয়েছেন, নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে ঠিক কোন এলাকায় তাঁরা আটকে রয়েছেন, তা এখনও নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি।
উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবহাওয়া। তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি ও তুষারপাত চলছে। ফলে নতুন করে তুষারধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও একাধিক প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থলপথেও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে। উদ্ধারকাজে আবহাওয়ার উন্নতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রেকিংয়ের অন্যতম আয়োজক মিংমা গিয়ালজে শেরপার বক্তব্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই ওই এলাকায় খারাপ আবহাওয়া এবং সম্ভাব্য দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেই সতর্কবার্তার পর বেশ কয়েকটি পর্বতারোহী দলকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তবে অভিযোগ, সতর্কবার্তার পরও কয়েকজন স্বেচ্ছায় ওই এলাকায় থেকে যান। বর্তমানে নিখোঁজদের মধ্যে তাঁদের কয়েকজন থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার পর পাহাড়ি এলাকায় ট্রেকিং এবং পর্বতারোহণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রতিকূল হলে পর্যটক ও পর্বতারোহীদের প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেপালের তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে। ভারী বৃষ্টি, তুষারপাত, ভূমিধস এবং হড়পা বানের মতো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
এর আগে ভেটকোশী নদীকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হড়পা বানে তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন একাধিক জনপদ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। বহু মানুষ প্রাণ হারান এবং অনেকে নিখোঁজ হন। সেই ঘটনার ক্ষত এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্যেই নতুন করে তুষারধসের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষার সময় অতিবৃষ্টি এবং তার পরে তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তন অনেক সময় ভূমিধস ও তুষারধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দুর্গম এলাকায় এই ধরনের দুর্যোগ ঘটলে উদ্ধার অভিযান চালানোও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে নেপাল প্রশাসন পাহাড়ি এলাকায় থাকা পর্যটক ও ট্রেকারদের সতর্ক করেছে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে দুর্গম পথে যাত্রা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় তুষারপাত বা ভূমিধসের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া না যাওয়ার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ ও ট্রেকিং রুটে ভিড় করেন। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে এই অভিযানের ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় আবহাওয়া কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যেতে পারে।
হিমলাং হিমলের সাম্প্রতিক তুষারধস সেই ঝুঁকিরই আরেকটি উদাহরণ। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
উদ্ধারকারীদের লক্ষ্য আপাতত নিখোঁজ ১০ জনের সন্ধান করা এবং তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে নতুন করে যাতে কেউ বিপদের মধ্যে না পড়েন, সেদিকেও নজর রাখছে নেপাল প্রশাসন।



