এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার জেরে ভারত ও চিনের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কিছুটা কমেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের খবর সামনে আসতেই স্বস্তির আশা দেখছে দুই দেশ। তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে নতুন করে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না।
রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বন্ধ না করলে কড়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই অবস্থান থেকে সরে আসার খবর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশের জ্বালানি আমদানি এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। শুল্ক আরোপের প্রস্তাব, সেই শুল্ক কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা এবং বাস্তবে কোনও দেশের পণ্যের উপর শুল্ক আদায়—এই তিনটি বিষয় এক নয়। তাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সঠিক প্রভাব বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশের শর্ত এবং সরকারি নথি বিবেচনা করা জরুরি।
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে ট্রাম্পের নতুন নির্দেশের দিকে নজর দিতে হবে। ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ আইনে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। এই আইনের আওতায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর বা তার পরে রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারত।
কিন্তু শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৬ অক্টোবর স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী নির্দেশে ট্রাম্প ওই আইনের আওতায় থাকা বেশ কয়েকটি শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আপাতত মকুব করেন। ফলে প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়।
অর্থাৎ, ভারতীয় পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক ইতিমধ্যেই বসানো হয়েছিল এবং পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই ট্রাম্প তার প্রয়োগ স্থগিত করেছেন।
ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে অপরিশোধিত তেল কেনা ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আমেরিকা যদি ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করত, তাহলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। ফলে বাণিজ্য, উৎপাদন এবং রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলির উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা ছিল।
নতুন নির্দেশে সেই নির্দিষ্ট শুল্কের ঝুঁকি আপাতত কমেছে। তবে ভারতের উপর অন্য কোনও শুল্ক বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নেই, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। ট্রাম্পের নির্দেশে মকুব করা ব্যবস্থাগুলি ভবিষ্যতে আবার কার্যকর করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
হ্যাঁ, চিনও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবিত দেশ। রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা হিসেবে চিনের উপরও নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা ছিল।
ট্রাম্পের নির্বাহী নির্দেশের ফলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনার সঙ্গে যুক্ত ওই বিশেষ শুল্ক আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। এতে ভারত ও চিন—দুই দেশেরই রপ্তানিকারকদের জন্য সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপ কমেছে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে আমেরিকার সঙ্গে দুই দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক বিরোধের অবসান হিসেবে দেখা যাবে না। শুল্কনীতি, জ্বালানি আমদানি এবং ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সময়কাল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার আইনে স্বাক্ষর করার পরই তাঁর প্রশাসন রুশ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ডিজেল বিশ্ববাজারে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি এই নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
তবে ভারতের উপর শুল্ক মকুবের একমাত্র কারণ রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার জ্বালানি চুক্তি—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যায় না। হোয়াইট হাউসের নির্দেশে ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্তকে মার্কিন জাতীয় স্বার্থের অনুকূল বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নির্বাহী নির্দেশে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ছাড় অনির্দিষ্টকাল বহাল থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আবার পদক্ষেপ করতে পারে।
তাই ভারতের জন্য বর্তমান সিদ্ধান্ত বড় স্বস্তির হলেও বিষয়টি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো নয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামের পরিবর্তন—এই তিনটি বিষয়ের উপর আগামী দিনের পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কমেছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তন, নাকি সাময়িক কৌশলগত পদক্ষেপ—সেটিই এখন দেখার বিষয়।



