সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeশিল্প ও সাহিত্যকমল দাশগুপ্ত: নজরুল গানের অমর সুরকারের বিস্মৃত জীবনগাথা

কমল দাশগুপ্ত: নজরুল গানের অমর সুরকারের বিস্মৃত জীবনগাথা

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পরিচিত রণসঙ্গীত ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’-এর সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত। গানটি দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শৃঙ্খলা, সাহস ও উদ্দীপনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিচিত সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান ছাড়া একটি পুরো যুগের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কমল দাশগুপ্ত ছিলেন তেমনই একজন সুরকার। কাজী নজরুল ইসলামের চার শতাধিক গানে সুর দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা আধুনিক গান, চলচ্চিত্র, ইসলামী সংগীত, গজল, লোকগানসহ নানা ধারায় তিনি রেখে গেছেন অসামান্য সৃষ্টির স্বাক্ষর।

অথচ জীবনের শেষদিকে সেই সুরের জাদুকরকেই কাটাতে হয়েছে আর্থিক সংকট, অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে।

আজ নজরুলগীতি শুনলে আমরা কবির কথা মনে করি। কিন্তু সেই গানের সুরের পেছনে থাকা কমল দাশগুপ্তের নাম অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

নজরুলের আস্থাভাজন সুরকার

“এমনি বরষা ছিল সেদিন”, “মেনেছি গো হার মেনেছি”, “ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে”, “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে”, “আমি বনফুল গো”—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কমল দাশগুপ্তের নাম।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানের সুর করার ক্ষেত্রে কমল দাশগুপ্তকে বিশেষ আস্থা দিতেন। এমনকি নিজের গান স্বাধীনভাবে সুর করারও সুযোগ দিয়েছিলেন তাঁকে।

নজরুল একবার কমল দাশগুপ্তের প্রতি নিজের আস্থার কথা বোঝাতে বলেছিলেন, একজন বাবা যেমন যোগ্য পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হন, তেমনই তিনি তাঁর গান কমলের হাতে তুলে দিয়ে প্রশান্তি পেতেন।

এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, নজরুল তাঁর গানের সুরের ক্ষেত্রে কমল দাশগুপ্তকে কতটা বিশ্বাস করতেন।

মাত্র ২৩ বছর বয়সেই সঙ্গীত পরিচালক

কমল দাশগুপ্তের প্রতিভার প্রকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সেই। ১৯৩০ সালে তাঁর সুর করা গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়।

এরপর তিনি এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানিতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পান। মাত্র ২৩ বছর বয়সে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া তাঁর অসাধারণ প্রতিভারই পরিচয় বহন করে।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি প্রায় ৮ হাজার ৫০০ গানে সুর করেছিলেন বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

খেয়াল থেকে কীর্তন, কাওয়ালি থেকে ইসলামী সংগীত, আধুনিক বাংলা গান থেকে নজরুলগীতি, গজল থেকে লোকগান—বিভিন্ন ধারায় তাঁর সুরের বিচরণ ছিল।

বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু ও তামিল চলচ্চিত্রেও তিনি সুরারোপ করেছেন।

‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’-এর সুরকার

কমল দাশগুপ্তের সংগীত প্রতিভার বিস্তার শুধু বাংলা গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পরিচিত রণসঙ্গীত ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’-এর সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত। গানটি দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শৃঙ্খলা, সাহস ও উদ্দীপনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিচিত সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এমন বৈচিত্র্যময় কাজই কমল দাশগুপ্তকে তাঁর সময়ের অন্যতম বহুমুখী সুরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

যশোর-নড়াইলের গ্রাম থেকে সংগীতের জগতে

১৯১২ সালে যশোর-নড়াইলের বেন্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কমল দাশগুপ্ত। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

পড়াশোনার জন্য তিনি কলকাতায় যান। পরে কুমিল্লা কলেজ থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন। সংগীতের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে এগিয়ে নেন। ১৯৪৩ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব মিউজিক ডিগ্রি লাভ করেন বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

সেই সময় সংগীত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে দ্রুত আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

ফিরোজা বেগম ও কমল দাশগুপ্ত

বাংলা নজরুলসংগীতের ইতিহাসে ফিরোজা বেগম ও কমল দাশগুপ্তের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়।

ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে নজরুলের গান জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কমল দাশগুপ্তের সুরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর সুর ও ফিরোজা বেগমের কণ্ঠ মিলে তৈরি হয়েছিল নজরুলসংগীতের এক স্বতন্ত্র পরিবেশ।

১৯৫৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়।

তবে তাঁদের এই সম্পর্ক তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় সহজ ছিল না। ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের কারণে তাঁদের নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকায় এসে কমল দাশগুপ্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘মোহাম্মদ কামালউদ্দিন আহমেদ’ নাম গ্রহণ করেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।

সুরের জগৎ থেকে মুদি দোকানে

কমল দাশগুপ্তের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাঁর শেষ জীবনের আর্থিক সংকট।

একসময় যিনি গ্রামোফোন কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সুরকার, অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা এবং সংগীতজগতের পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, জীবনের শেষদিকে তাঁকেই ঢাকার হাতিরপুলে মুদি দোকান চালাতে হয়েছিল।

দোকানটির নাম ছিল ‘পথিক’।

সেখানে তেল, নুন, মুড়ি, বিস্কুটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করতেন তিনি।

সূত্রে বলা হয়েছে, নাথ ব্যাংক ধসে যাওয়ার পর তাঁর আর্থিক অবস্থার বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ধীরে ধীরে তাঁর সম্পদ, সামাজিক অবস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা কমে আসে।

একজন খ্যাতিমান সুরকারের জীবনে এমন পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

শেষ জীবনে অবহেলা ও নিঃসঙ্গতা

জীবনের শেষভাগে কমল দাশগুপ্ত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছেন বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বিশেষ কেবিন না পাওয়ার একটি ঘটনাও তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অবহেলার চিত্র হিসেবে উঠে এসেছে।

১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি সুরকার। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

যে মানুষটির সুরে একসময় অসংখ্য শ্রোতা আবেগে ভেসেছেন, তাঁর শেষ জীবনের এই বাস্তবতা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে একটি বেদনাময় অধ্যায় হয়ে আছে।

শাফিন আহমেদের মৃত্যুর পর আবার আলোচনায়

কমল দাশগুপ্তের পুত্র শাফিন আহমেদও সংগীতজগতের পরিচিত শিল্পী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আবারও অনেকের আলোচনায় আসে কমল দাশগুপ্তের জীবন ও সংগীতকর্ম।

শাফিন আহমেদও ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতায় জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল মনোজিৎ দাশগুপ্ত বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাবার মতোই তিনিও সংগীতকে নিজের পেশা ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছিলেন। তবে কমল দাশগুপ্তের সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি ছিল নিজস্ব ও স্বতন্ত্র।

কেন আড়ালে পড়ে গেল তাঁর নাম?

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কমল দাশগুপ্তের অবদান বিশাল হলেও নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর নাম তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত।

নজরুলের গান নিয়ে আলোচনা হলে কবির কথা স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। শিল্পীদের কণ্ঠ নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু সেই গানকে শ্রোতার কাছে নতুন রূপে পৌঁছে দেওয়া সুরকারদের নাম অনেক সময় পিছনে পড়ে যায়।

কমল দাশগুপ্তের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে বলে মনে করেন তাঁর সংগীতের অনুরাগীরা।

অথচ আধুনিক বাংলা গান, নজরুলগীতি ও চলচ্চিত্র সংগীতে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের ছাপ রয়েছে।

তাঁর সুর এখনও বেঁচে আছে

সময় বদলেছে। রেকর্ডপ্লেয়ারের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। পুরোনো গানের মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু কমল দাশগুপ্তের সুর হারিয়ে যায়নি।

আজও “এমনি বরষা ছিল সেদিন” কিংবা “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে”-এর মতো গান মানুষের মনে আবেগ তৈরি করে।

সুরকার হয়তো অনেক সময় গানের সামনে থাকেন না। তাঁর নাম শিল্পীর মতো প্রতিটি শ্রোতার মুখে মুখে ফেরে না। কিন্তু একটি গানের আবেগ, মাধুর্য ও স্থায়িত্ব তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গভীর।

কমল দাশগুপ্তের জীবন সেই সত্যেরই একটি বড় উদাহরণ।

খ্যাতির শীর্ষ থেকে আর্থিক সংকট, সংগীতের জগৎ থেকে মুদি দোকান—তাঁর জীবনের পথ ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা।

কিন্তু মানুষের জীবনের পরিস্থিতি বদলালেও সৃষ্টিশীলতার মূল্য হারায় না।

কমল দাশগুপ্ত হয়তো জীবনের শেষদিকে প্রাপ্য আলো থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু তাঁর সুর আজও বেঁচে আছে।

বাংলা গান যতদিন শোনা হবে, নজরুলের গান যতদিন নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ফিরবে, ততদিন সেই সুরের নেপথ্যের কারিগর কমল দাশগুপ্তের নামও স্মরণ করার মতোই থাকবে।

সূত্র: তসলিমা নাসরিনের ফেসবুক পোস্ট।

লেখাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সূত্রে থাকা ঐতিহাসিক তথ্য ও দাবিগুলো আলাদা উৎসে যাচাই করে নেওয়া উত্তম।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ