এনবি সংবাদ, অনলাইন : পৃথিবীর বুক থেকে ডোডো পাখি হারিয়ে গেছে কয়েকশো বছর আগে। আজ আর কোনও জঙ্গলে দেখা মেলে না এই অদ্ভুত দেখতে পাখিটির। তাই ডোডো সম্পর্কে আমাদের ধারণা তৈরি হয়েছে মূলত পুরনো ছবি, সংরক্ষিত হাড় এবং ঐতিহাসিক বিবরণের উপর নির্ভর করে। বড় শরীর, ছোট ডানা এবং সামনের দিকে বাঁকানো বিশাল ঠোঁট—এই বৈশিষ্ট্যগুলিই ডোডোকে অন্য পাখিদের থেকে আলাদা করে চিনিয়েছে।
কিন্তু বিলুপ্তির কয়েকশো বছর পরেও ডোডোকে নিয়ে গবেষণা থেমে নেই। বরং প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এবার তার মাথার ভিতরের গঠন পরীক্ষা করে এমন কিছু তথ্য পেয়েছেন, যা এই পাখিটির জীবনযাপন সম্পর্কে পুরনো ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
অতি বিরল কয়েকটি ডোডোর খুলি সিটি স্ক্যান করে এবং তার ভিত্তিতে ডিজিটাল পুনর্গঠন চালিয়ে গবেষকেরা পাখিটির দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণশক্তি এবং পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা নিয়ে নতুন ইঙ্গিত পেয়েছেন।
ডোডোর খুলির গঠন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকদের নজরে এসেছে তার চোখের কোটরের আকার। তুলনামূলক ভাবে বড় চোখের কোটর দেখে বোঝা যায়, দৃষ্টিশক্তি তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
তবে শুধু চোখের আকার দেখেই ডোডোর দৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় না। মস্তিষ্কের যে অংশ দৃষ্টির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ডোডোর মস্তিষ্কে এই চাক্ষুষ প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল তুলনামূলক ভাবে ছোট ছিল।
এই বৈশিষ্ট্য থেকেই গবেষকদের ধারণা, ডোডো শুধু দিনের উজ্জ্বল সময়েই সক্রিয় থাকত এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ভোরের আলো কিংবা গোধূলির অপেক্ষাকৃত কম আলোতেও তার চলাফেরা বা খাদ্য অনুসন্ধানের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডোডো পুরোপুরি নিশাচর পাখি ছিল। বরং তার কার্যকলাপ দিনের পাশাপাশি আলো কম থাকা সময়েও কিছুটা বিস্তৃত হতে পারে—এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে খুলির গঠন।
ডোডোর জীবনযাত্রা সম্পর্কে নতুন গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে তার ঘ্রাণশক্তি। মস্তিষ্কের ঘ্রাণ শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত অংশটি তুলনামূলক ভাবে উন্নত ছিল বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর অর্থ হতে পারে, চারপাশের পরিবেশ বোঝা কিংবা খাবারের সন্ধান করার ক্ষেত্রে ডোডো ঘ্রাণের উপর যথেষ্ট নির্ভর করত।
পাখিদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি অনেক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ডোডোর মস্তিষ্কের গঠন বলছে, পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তার ঘ্রাণশক্তিরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকতে পারে।
মাটিতে খাবার খোঁজা কিংবা কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যের উপস্থিতি শনাক্ত করার সময় এই ক্ষমতা তাকে সাহায্য করে থাকতে পারে। অবশ্য ঠিক কীভাবে সে ঘ্রাণ ব্যবহার করত, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ডোডোর সবচেয়ে পরিচিত শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলির একটি তার বড় ও বাঁকানো ঠোঁট। এতদিন এই ঠোঁটকে মূলত খাদ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করেই দেখা হয়েছে। কিন্তু নতুন বিশ্লেষণ থেকে ঠোঁটটির আরও একটি সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ঠোঁটের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুর গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ডোডো ঠোঁটের মাধ্যমে স্পর্শসংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করতে পারত।
অর্থাৎ ঠোঁটটি শুধু খাবার ধরার যন্ত্র ছিল না। আশপাশের কোনও বস্তু সম্পর্কে স্পর্শের মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।
এমন ক্ষমতা থাকলে মাটিতে খাবার খোঁজা, কোনও বস্তু পরীক্ষা করা কিংবা পরিবেশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বোঝার সময় ডোডো তার ঠোঁটকে এক ধরনের সংবেদনশীল অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারে।
ডোডোকে বহুদিন ধরেই জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ‘বোকা’ বা অত্যন্ত নির্বোধ পাখি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু নতুন গবেষণার ফল সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
ডোডোর মস্তিষ্কের আকার এবং গঠন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন কোনও প্রমাণ পাননি, যা তাকে অত্যন্ত দুর্বল মস্তিষ্কের পাখি হিসেবে চিহ্নিত করে। বরং আধুনিক পায়রা ও ঘুঘুর সঙ্গে তুলনা করলে ডোডোর মস্তিষ্কের গঠন অস্বাভাবিক ভাবে দুর্বল ছিল না বলেই গবেষণার ফল ইঙ্গিত করছে।
অর্থাৎ ডোডো দেখতে অদ্ভুত ছিল বা উড়তে পারত না বলেই তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা কম ছিল—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার কৌশল শুধু তার শরীরের গঠন বা উড়তে পারার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে না। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, খাবার খোঁজা, শিকারি এড়ানো এবং চারপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার মতো ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ডোডোর ক্ষেত্রে নতুন গবেষণা সেই দিকটিই সামনে আনছে।
ডোডোর মতো বিলুপ্ত প্রাণীর আচরণ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার কোনও সুযোগ নেই। তাই বিজ্ঞানীদের নির্ভর করতে হয় জীবাশ্ম, সংরক্ষিত হাড়, খুলি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের উপর।
আধুনিক সিটি স্ক্যান প্রযুক্তি সেই গবেষণাকে আরও এগিয়ে দিয়েছে। খুলির ভিতরের অংশ না কেটেই তার ত্রিমাত্রিক গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে ডিজিটাল মডেল তৈরি করে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের আনুমানিক গঠন ও আকার বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতেই ডোডোর চোখ, ঘ্রাণ-সংক্রান্ত মস্তিষ্কের অংশ এবং ঠোঁটের স্নায়ুর গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।
ডোডো পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও তার শরীরের অবশিষ্টাংশ বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার উপাদান। প্রতিটি খুলি, প্রতিটি হাড় কিংবা সংরক্ষিত নমুনা যেন অতীতের একটি দরজা খুলে দেয়।
নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, ডোডো হয়তো আমাদের প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল প্রাণী ছিল। তার দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণশক্তি এবং ঠোঁটের সংবেদনশীলতার সম্ভাব্য ভূমিকা থেকে বোঝা যায়, দ্বীপের পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য তার নিজস্ব কিছু অভিযোজন তৈরি হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, ‘বোকা ডোডো’ হিসেবে যে ছবি এতদিন মানুষের মনে ছিল, বিজ্ঞান সেই ধারণাকে সরলীকৃত বলে দেখাচ্ছে। কয়েকশো বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই পাখির খুলির ভিতর লুকিয়ে থাকা তথ্যই যেন তার হারিয়ে যাওয়া জীবনকে আবার একটু একটু করে সামনে নিয়ে আসছে।



