এনবি সংবাদ, অনলাইন : অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় সাধারণত বাস, ট্রেন, গাড়ি কিংবা মোটরবাইকের কথাই মাথায় আসে। কেউ যান হেঁটে, কেউ আবার সাইকেলে। কিন্তু অফিস থেকে বাড়ি ফেরার জন্য যদি কেউ নদীতে নেমে সাঁতার কাটতে শুরু করেন, তাহলে দৃশ্যটি যে চোখ কপালে তোলার মতো হবে, তা বলাই বাহুল্য।
তবে সুইৎজারল্যান্ডের দুটি শহরে গরমের দিনে এমন দৃশ্য একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। সেখানে অনেক মানুষ দিনের কাজ শেষ করে গাড়ি বা গণপরিবহণে বাড়ি ফেরার বদলে নদীতে নেমে পড়েন। তারপর স্রোতের সঙ্গে ভেসে ভেসে পৌঁছে যান বাড়ির কাছের ঘাটে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এটি কোনও প্রতিযোগিতা বা বিশেষ আয়োজন নয়। অনেকের কাছে এটি দিনের শেষে বাড়ি ফেরার এক আনন্দদায়ক উপায়।
সুইৎজারল্যান্ডের বার্ন ও বাসেল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে যথাক্রমে আরা ও রাইন নদী। গ্রীষ্মের সময় বিকেলের দিকে এই দুই নদীর তীরে দেখা যায় অন্যরকম ব্যস্ততা।
দিনের কাজ শেষ করে অনেকেই নদীর ধারে চলে আসেন। সেখানে অফিসের পোশাক বদলে তাঁরা পরে নেন সাঁতারের উপযোগী পোশাক। এরপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটি জলরোধী ব্যাগে ভরে নদীতে নেমে পড়েন।
তারপর নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলতে চলতেই শুরু হয় বাড়ি ফেরার যাত্রা।
নদীতে সাঁতার কাটতে গেলে সঙ্গে থাকা জিনিসপত্রের কী হবে? এই সমস্যারও সমাধান রয়েছে। এই যাত্রায় ব্যবহারের জন্য বিশেষ ধরনের জলরোধী ব্যাগ ব্যবহার করেন অনেকে।
অফিসের পোশাক, তোয়ালে, মোবাইল ফোনসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সেই ব্যাগে রাখা হয়। এমনকি কেউ কেউ অফিসের ল্যাপটপও জলরোধী ব্যাগে বহন করেন।
ব্যাগটি শরীরের সঙ্গে রেখে নদীতে নামেন তাঁরা। ফলে সাঁতার কাটার সময়ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে থাকে।
এই যাত্রাকে শুধুই সাঁতার কাটা বললে কিছুটা ভুল হবে। নদীর স্রোত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। নদীতে নামার পর অনেকে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যেতে থাকেন। ফলে একটানা দ্রুত সাঁতার কাটার প্রয়োজন হয় না।
কেউ কেউ নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নদীতে নামেন, আবার কোথাও সেতুর কাছ থেকেও মানুষকে জলে নামতে দেখা যায়। এরপর নদীর স্রোত তাঁদের শহরের অন্য প্রান্তের দিকে নিয়ে যায়।
অবশ্য নদীর জলে নামা কখনওই ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই এই ধরনের যাত্রায় স্থানীয় নদীর পরিস্থিতি, আবহাওয়া, স্রোত এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
নদীতে ভেসে চলার পর বাড়ির কাছাকাছি ঘাট এসে গেলে সেখানেই উঠে পড়েন তাঁরা। বিভিন্ন ঘাটে পোশাক বদলানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
জল থেকে উঠে জলরোধী ব্যাগ খুলে শুকনো পোশাক পরে নেন। তারপর নদীর ধারে শেষ করে বাড়ির পথে রওনা দেন।
কারও ক্ষেত্রে এই নদীপথে বাড়ি ফিরতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। আবার কারও একটু বেশি সময় লাগে। নদীতে যাত্রার দূরত্ব ও স্রোতের গতির উপর সময়টা নির্ভর করে।
সুইৎজারল্যান্ডের রাজধানী বার্নের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আরা নদী। গ্রীষ্মকালে নদীর জল তুলনামূলক আরামদায়ক থাকলে বিকেলের দিকে সেখানে স্থানীয়দের ভিড় বাড়ে।
কাজ শেষ করে অনেকেই নদীর দিকে চলে আসেন। এরপর জলে নেমে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেন। কারও কাছে এটি যাতায়াতের মাধ্যম, আবার কারও কাছে দিনের শেষে শরীর ও মনকে হালকা করার একটি উপায়।
শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে নদীতে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগও এই অভ্যাসকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বার্নের মতো বাসেল শহরেও নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনই এক বিশেষ সংস্কৃতি। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাইন নদীতে গ্রীষ্মের বিকেলে অনেক মানুষকে ভেসে যেতে দেখা যায়।
কেউ একা, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নদীতে নামেন। জলরোধী ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে তাঁরা স্রোতের সঙ্গে ভেসে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যান।
কারও বাড়ির কাছে পৌঁছতে ১০ মিনিটের মতো সময় লাগে, কারও লাগে ২০ মিনিট বা তারও বেশি। সময়টা মূলত নদীর স্রোত এবং যাত্রার দূরত্বের উপর নির্ভর করে।
শুধু পরিবহণের সুবিধার জন্যই এই অভ্যাস জনপ্রিয় হয়নি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আনন্দ এবং শরীরচর্চার বিষয়টিও।
সারাদিন অফিসে কাজ করার পর ঠান্ডা নদীর জলে নেমে কিছুটা সময় ভেসে চলা অনেকের কাছে মানসিক চাপ কমানোর উপায়। একদিকে বাড়ি ফেরার পথ, অন্যদিকে শরীরচর্চা ও প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ—দুটি বিষয় একসঙ্গে মিলে যায়।
গরমের দিনে ঠান্ডা জলে ভেসে চলা শরীরকেও সতেজ করে। ফলে অফিসের ক্লান্তি কাটিয়ে বাড়ি ফেরার সময়টুকুই হয়ে ওঠে দিনের অন্যতম উপভোগ্য মুহূর্ত।
দৃশ্যটি যতই আনন্দদায়ক হোক, নদীতে সাঁতার কেটে বাড়ি ফেরার বিষয়টি ঝুঁকিমুক্ত নয়। নদীর স্রোত কখনও দ্রুত হতে পারে, জলস্তর বদলে যেতে পারে এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনও বিপদ তৈরি করতে পারে।
তাই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে এবং নিরাপদ পরিস্থিতিতেই নদীতে নামেন মানুষ। বিশেষ করে পর্যটক বা বাইরে থেকে যাওয়া কারও জন্য স্থানীয় নদীর নিয়ম ও ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনে এই অভ্যাস অনুসরণ করা ঠিক নয়।
তার পরেও বার্নের আরা এবং বাসেলের রাইন নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই জীবনযাত্রা নিঃসন্দেহে অভিনব। যেখানে অন্য শহরে অফিস ছুটির পর মানুষ যানজটে আটকে বাড়ি ফেরেন, সেখানে এই দুই শহরের বহু মানুষ দিনের শেষে নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে বাড়ি ফেরার আনন্দ উপভোগ করেন।
এক কথায়, তাঁদের কাছে বাড়ি ফেরার পথ শুধু যাতায়াত নয়—এ যেন প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে নদীকে মিশিয়ে নেওয়া এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।



