সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিশ্ব সংবাদইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেও রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের বড় জয়, ৩৫৫ আসন ইউনাইটেড রাশিয়ার

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেও রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের বড় জয়, ৩৫৫ আসন ইউনাইটেড রাশিয়ার

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই নির্বাচনকে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে দেশের রাজনৈতিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। নির্বাচনের ফল ইউনাইটেড রাশিয়ার পক্ষে যাওয়ায় ক্রেমলিন এটিকে নিজেদের নীতির প্রতি জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদীয় নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন শাসকদল ইউনাইটেড রাশিয়া। ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনার পর দলটি ৫৭.৮৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ৪৫০ আসনের স্টেট ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়া ৩৫৫টি আসন পেতে চলেছে। এর ফলে সংসদে দলটির সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটাই রাশিয়ার প্রথম সংসদীয় নির্বাচন। ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর তিন দিন ধরে ভোটগ্রহণ হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে যেমন আগ্রহ ছিল, তেমনই বিরোধীদের অংশগ্রহণ, ভোটের পরিবেশ এবং ইউক্রেনের দখল করা অঞ্চলগুলিতে ভোটগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এলা পামফিলোভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯৫.১৮ শতাংশ ভোট গণনার পর ইউনাইটেড রাশিয়া পেয়েছে ৫৭.৮৩ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি, তাদের ভোট ১৩.৮১ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে রয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপিআর, তাদের ভোট ৮.৯৮ শতাংশ। নিউ পিপল পেয়েছে ৭.৯৬ শতাংশ ভোট।

এই ফল অনুযায়ী ইউনাইটেড রাশিয়া ৪৫০ সদস্যের স্টেট ডুমায় ৩৫৫টি আসন পেতে চলেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি ৩১৫টি আসন পেয়েছিল। অর্থাৎ নতুন ফলাফলে সংসদে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই নির্বাচনকে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে দেশের রাজনৈতিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। নির্বাচনের ফল ইউনাইটেড রাশিয়ার পক্ষে যাওয়ায় ক্রেমলিন এটিকে নিজেদের নীতির প্রতি জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

তবে নির্বাচনের ফলকে সরাসরি রাশিয়ার সব নাগরিকের যুদ্ধনীতির সমর্থনের সমান হিসেবে দেখা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সমালোচকদের একটি অংশ রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধীদের ওপর চাপ এবং স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ ভোটের ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তথ্য হলেও, এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্বাচনের পরিবেশও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

রাশিয়ার স্টেট ডুমায় প্রবেশ করা প্রধান দলগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি, এলডিপিআর, নিউ পিপল এবং এ জাস্ট রাশিয়া। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে এসব দলের অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেমলিনের গুরুত্বপূর্ণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ কারণে রাশিয়ার সংসদে ইউনাইটেড রাশিয়ার বিপরীতে শক্তিশালী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কতটা তৈরি হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা করা ইয়াবলোকো দলের অবস্থান ছিল আলাদা। কিন্তু নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় দলটির অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্যেও উল্লেখ করা হয়েছে যে রাশিয়ায় সরকারবিরোধী ও যুদ্ধবিরোধী শক্তির ওপর প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে স্বাধীন বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ছিল।

এই নির্বাচনের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ছিল ইউক্রেনের রাশিয়ার দখলে থাকা অংশে ভোটগ্রহণ। দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়ার দখল করা অংশে রাশিয়ার স্টেট ডুমা নির্বাচনের ভোট নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এসব অঞ্চল ইউক্রেনের অংশ হিসেবেই স্বীকৃত।

রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনের এই চার অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেছিল। কিন্তু ইউক্রেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহৎ অংশ সেই দাবি স্বীকার করেনি।

ইন্টারন্যাশনাল IDEA-ও রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রুশ আইনসভার নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে দখলদার শক্তির আইনসভার নির্বাচন আয়োজন আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইউক্রেন শুরু থেকেই এই ভোটের বিরোধিতা করেছে। কিয়েভের বক্তব্য, রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রুশ নির্বাচন আয়োজন অবৈধ এবং এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলগুলির ওপর মস্কোর নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও নির্বাচনের ওই অংশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বরের এক বিবৃতিতে ইইউ রাশিয়ার দখল করা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে স্টেট ডুমা নির্বাচন আয়োজনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যও যৌথ বিবৃতিতে একই ধরনের আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়ায় রুশ নির্বাচন আয়োজন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার লঙ্ঘন।

রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকে নিয়মমাফিক ও সুষ্ঠু হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারবিরোধীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি রাশিয়া OSCE-কে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক আমন্ত্রণ জানায়নি বলেও ইইউ উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কিছু বিরোধী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি এবং যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। ইলেকট্রনিক ভোটিং নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে রাশিয়ার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ ভোটকে বৈধ ও সুষ্ঠু বলে দাবি করেছে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো রাশিয়ার সংসদে ইউনাইটেড রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ৩৫৫টি আসন পাওয়ার প্রাথমিক ফলাফল দলটিকে ৪৫০ আসনের ডুমায় সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিচ্ছে। এর ফলে আইন প্রণয়ন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলটির হাতে আরও বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকবে।

তবে এই ফলকে শুধু পুতিনের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধীদের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং দখল করা ইউক্রেনীয় অঞ্চলে ভোটগ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক বিবেচনা করা জরুরি।

রাশিয়ার জন্য এই নির্বাচন তাই শুধু সংসদে নতুন সদস্য বেছে নেওয়ার ঘটনা নয়। এটি ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ক্রেমলিনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কতটা অটুট রয়েছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আপাতত নির্বাচনী ফলাফলে সেই নিয়ন্ত্রণের কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং ইউনাইটেড রাশিয়ার আসনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রাথমিক ফল রুশ সংসদে পুতিনপন্থী শক্তির অবস্থান আরও মজবুত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ