এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : দার্জিলিং পাহাড় মানেই চোখজুড়ানো সৌন্দর্য, মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি আর পর্যটকদের ভিড়। কিন্তু এই মনোরম পাহাড়ের নীচেই সক্রিয় রয়েছে এক জটিল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। হিমালয় এখনও নবীন ও পরিবর্তনশীল পর্বতমালা হওয়ায় দার্জিলিং, কালিম্পং ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় ভূমিকম্প নতুন কোনও ঘটনা নয়। গত এক দশকে এই বিস্তৃত অঞ্চলে চারশোরও বেশি ভূমিকম্পের তথ্য সামনে এসেছে বলে গবেষণা সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
বেশিরভাগ কম্পনের মাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক সময় তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়নি। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকদের আশঙ্কা অন্য জায়গায়। তাঁদের মতে, ভূমিকম্পের সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস, দুর্বল ঢাল এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মাঝারি মাত্রার কম্পনও পাহাড়ি শহরগুলিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, ঢালু জমিতে বহুতল নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প। সব মিলিয়ে দার্জিলিং পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভূগবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, দার্জিলিং-কালিম্পং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় গত এক দশকে চারশোর বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে কয়েক ডজন কম্পনের ঘটনা ঘটেছে। মাসে গড়ে একাধিকবার মাটি কেঁপেছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে এই সংখ্যার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ভূমিকম্পই বড় বিপদের পূর্বাভাস। ছোট মাত্রার ভূমিকম্প সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে। অনেক কম্পন এতটাই দুর্বল যে মানুষ তা টেরও পান না।
চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূ-গবেষক মধুসূদন কর্মকারের বক্তব্য, দার্জিলিং পাহাড়ে বছরে গড়ে প্রায় ২৩টি ভূমিকম্প হতে পারে এবং প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর অন্তর বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনা দেখা যায়। তাঁর মতে, ভূমিকম্পের সঙ্গে ভূমিধসের সম্পর্ক থাকায় দার্জিলিংয়ের মতো পাহাড়ি শহরের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
দার্জিলিংয়ের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বুঝতে হলে হিমালয়ের জন্ম ও গঠন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম নবীন পর্বতমালা। ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট উত্তর দিকে এগিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই দুই প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও গতিবিধির ফলে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হয়। কোনও দুর্বল অংশ দিয়ে সেই শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
অর্থাৎ দার্জিলিংয়ের মাটি কাঁপার পিছনে শুধুমাত্র স্থানীয় কোনও কারণ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক কোটি বছর ধরে চলতে থাকা বৃহৎ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
এই কারণে হিমালয় অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভূ-গবেষকদের মতে, দার্জিলিং হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক গঠনও এর ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
দার্জিলিং অঞ্চলের পাহাড়ের বড় অংশ অপেক্ষাকৃত নবীন শিলাস্তর দ্বারা গঠিত। নবীন শিলাস্তর অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ও শক্ত শিলার তুলনায় বেশি ভঙ্গুর এবং ক্ষয়প্রবণ হতে পারে। বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প এবং মানুষের হস্তক্ষেপ একসঙ্গে কাজ করলে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
এ কারণেই ভূমিকম্পের পাশাপাশি ভূমিধস দার্জিলিং পাহাড়ের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপদ।
২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা এখনও অনেকের মনে রয়েছে। সেই ভূমিকম্পে নেপাল ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছিল। হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল যে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে, সেই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছিল।
দার্জিলিংও হিমালয় অঞ্চলের অংশ হওয়ায় বড় ভূমিকম্প হলে এখানেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বড় ভূমিকম্প হবেই—এমন ভবিষ্যদ্বাণী বিজ্ঞানসম্মতভাবে করা যায় না।
তাই এক দশকে শত শত ছোট ভূমিকম্প হয়েছে বলেই অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিকম্প আসছে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো ঠিক নয়। বরং এই তথ্যকে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রস্তুতি জোরদার করার কারণ হিসেবে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের অন্যতম জায়গা এখানেই। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় প্রাকৃতিক ঝুঁকি থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি মেনে চললে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কিন্তু দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াংয়ের মতো পাহাড়ি শহরে ঢালু জমিতে দ্রুত নগরায়ন হয়েছে। বহু জায়গায় পাহাড় কেটে বাড়ি, হোটেল, রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরি হয়েছে।
অপরিকল্পিতভাবে ভারী বহুতল নির্মাণ পাহাড়ের ঢালের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। আবার ভূমিকম্পের সময় দুর্বল নির্মাণ কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও বেশি।
ফলে ভূমিকম্প নিজে যতটা বিপজ্জনক, তার সঙ্গে দুর্বল নির্মাণ, পাহাড়ের ঢাল ও ভূমিধসের ঝুঁকি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দার্জিলিং পাহাড়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প চলছে। রাস্তা চওড়া করা, টানেল তৈরি কিংবা পাহাড়ের অংশ কেটে নতুন পথ তৈরি করার মতো কাজও হয়েছে।
পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এসব কাজ করা সম্ভব হলেও ভূগবেষকদের একাংশের মতে, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে বিবেচনা না করে ব্যাপক কাটাকাটি করলে ঢালের স্থিতিশীলতা কমতে পারে।
বিশেষ করে ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ের মাটি ও শিলাস্তর জল শোষণ করে দুর্বল হয়ে যায়। সেই অবস্থায় ভূমিকম্প হলে ভূমিধসের সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ পাহাড়ি এলাকায় উন্নয়ন বন্ধ করার বিষয় নয়; বরং উন্নয়ন কতটা বৈজ্ঞানিক, পরিবেশসম্মত এবং ভূমিকম্প-সহনশীলভাবে করা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিস্তা নদীকে ঘিরে একাধিক জলবিদ্যুৎ ও পরিকাঠামো প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এসব প্রকল্পের প্রভাব নিয়েও পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বড় ধরনের নির্মাণকাজ, পাহাড়ের ঢালে পরিবর্তন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ এবং ভূমির উপর অতিরিক্ত চাপ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে কোনও নির্দিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সরাসরি বড় ভূমিকম্প ঘটাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য আলাদা বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা এবং নিয়মিত পরিবেশ ও ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ জরুরি।
দার্জিলিং ও আশপাশের হিমালয় অঞ্চলের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘সিসমিক জোন সিক্স’ বা রিখটার স্কেলে ৮ থেকে ১০ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ভারতের প্রচলিত সরকারি সিসমিক জোনিং ব্যবস্থায় অঞ্চলগুলিকে সাধারণত Zone II, III, IV এবং V হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। তাই ‘Zone VI’ কথাটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উৎস ও মানচিত্রের সংস্করণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় ৮ থেকে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প হবেই বা হতে পারে—এমন সরল পূর্বাভাসও বিজ্ঞানসম্মত নয়।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয় ফল্ট, ভূতাত্ত্বিক গঠন, অতীতের ভূমিকম্প, মাটির বৈশিষ্ট্য, জনবসতি ও নির্মাণ কাঠামোসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করে।
ভূমিকম্প নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলির একটি হলো—ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে মানেই বড় ভূমিকম্প আসন্ন।
বৈজ্ঞানিকভাবে কোনও অঞ্চলে ভূমিকম্পের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নির্ণয় করা সম্ভব হলেও ঠিক কবে, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে, তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা এখনও সম্ভব নয়।
তাই দার্জিলিংয়ে গত এক দশকে চারশোর বেশি কম্পন হয়েছে—এই তথ্যকে আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে প্রস্তুতির কারণ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন থেকেই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
প্রথমত, পাহাড়ি এলাকায় নতুন নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণবিধি কঠোরভাবে মানাতে হবে। পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলিরও কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। ঢাল স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জলনিকাশী এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
চতুর্থত, ভূমিকম্পের পাশাপাশি ভূমিধসের ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। উন্নত সেন্সর, স্যাটেলাইট তথ্য এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
দার্জিলিংয়ের মতো পাহাড়ি অঞ্চলে উন্নয়ন মানুষের প্রয়োজন। রাস্তা, রেল, পর্যটন, হাসপাতাল, আবাসন এবং বিদ্যুৎ—সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে উন্নয়ন করলে ভবিষ্যতে সেই উন্নয়নই ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা হওয়া উচিত—উন্নয়ন বন্ধ নয়, বরং পাহাড়ের ধারণক্ষমতা বুঝে উন্নয়ন।
দার্জিলিং পাহাড়ে ছোট ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। গত এক দশকের কম্পনের তথ্যও এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তা থেকেই নিশ্চিতভাবে ‘বড় বিপর্যয় আসছে’ বলা যায় না।
বরং এই পরিস্থিতি প্রশাসন, নির্মাতা, গবেষক এবং সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সঠিক নির্মাণবিধি, বৈজ্ঞানিক ভূমি ব্যবহার, পাহাড় সংরক্ষণ, উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত উদ্ধার প্রস্তুতি থাকলে বড় ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দার্জিলিংয়ের সামনে তাই আসল চ্যালেঞ্জ শুধু ভূমিকম্প নয়। চ্যালেঞ্জ হল ভূমিকম্পপ্রবণ ও অস্থিতিশীল পাহাড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে নিরাপদ নগরায়ন ও উন্নয়ন করা যায়। পাহাড় বাঁচিয়ে উন্নয়নের সেই ভারসাম্যই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।



