সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট

Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা হাসিনার, সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা হাসিনার, সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরতে চান এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন বলে তিনি জানান।

রাহুল রাহা, এনবি সংবাদ, দিল্লি থেকে : বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। পরে আগস্টেও দিল্লি থেকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ডিসেম্বরকে দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে ১৪ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে আলোচনা থাকলেও, এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে সেই তারিখ নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ডিসেম্বরের পরিকল্পনাটিই নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা যায়; নির্দিষ্ট দিনটি এখনো অনিশ্চিত।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। দুই বছর পর চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার একটি সময়সীমা জানান।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরতে চান এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন বলে তিনি জানান।

এরপর আগস্টে দিল্লিতে এক সংবাদমাধ্যমের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও তিনি ডিসেম্বরকে দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরতে চান।

তবে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট দিন সম্পর্কে তিনি প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত তারিখ জানাননি।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ও নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলো। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। শেখ হাসিনা এই অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া এই রায়ের কারণে দেশে ফিরলে তাঁকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা স্বীকার করেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সম্ভাব্য পরিণতি জেনেও দেশে ফিরতে চান।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারও তাঁর প্রত্যাবর্তনকে সাধারণ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছে না। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার আইনি পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। তাঁর সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটির নেতাদের একটি অংশ দেশে আত্মগোপনে এবং অন্য একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করছে।

জুলাইয়ের সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, সেটির সিদ্ধান্ত জনগণের মাধ্যমে হওয়া উচিত। তিনি বিদেশে থেকেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান।

আগস্টে তাঁর বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকার তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে আপত্তি জানায়। অন্যদিকে ভারত সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই মিডিয়া ইভেন্টে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না।

শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বর মাসে জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

কমিশনের প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৩ ডিসেম্বর হওয়ার কথা। পরবর্তী ধাপগুলো ডিসেম্বরের শেষ থেকে শুরু করে ২০২৭ সালের মে পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনসূচির সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময়কে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত করে বিভিন্ন দাবি করা হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঠেকাতেই নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজন করা হয়েছে—এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলীয় সূত্র উদ্ধৃত করে কিছু প্রতিবেদনে ১৪ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও প্রকাশ্য বক্তব্যে শেখ হাসিনা নিজে এখনো ১৪ ডিসেম্বরকে চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের দিন হিসেবে ঘোষণা করেননি। বরং তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাই এসেছে।

ফলে ১৪ ডিসেম্বরের বিষয়টি আপাতত দলীয় সূত্রনির্ভর দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও যুক্ত। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে।

তাই শেখ হাসিনা যদি নিজের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো—তিনি নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দেশে ফিরলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে ১৪ ডিসেম্বরকে প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট দিন হিসেবে যে আলোচনা চলছে, সেটি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। ফলে শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাব্য সময় হিসেবে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুর দিকেই নজর থাকবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ